অন্তরঙ্গ “তাঁহার কথা”
শ্রীপ্রভাতচন্দ্র চক্রবর্তী
অধুনা বিলুপ্ত "ভারতের সাধনা" নামক মাসিক পত্রিকায় অনেক বৎসর পূর্বে অন্তরঙ্গ "তাঁহার কথা" শীর্ষক একটি প্রবন্ধ আমাদের শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ডক্টর ‘প্রভাতচন্দ্র চক্রবর্তী’ মহাশয় প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাহাতে ঠাকুরের আধ্যাত্মিক জীবনের কতক পরিচয় পাওয়া যাইবে মনে করিয়া পাঠকগণের কৌতূহল চরিতার্থের নিমিত্ত এখানে লিপিবদ্ধ করা হইল।
১
আজ যাঁহার কথা বলিতে যাইতেছি, দুঃখের বিষয়, তাঁহার কথা বুঝি নাই—বুঝিবার মত সামর্থ্যও নাই। সে মানুষটিকে যেমন সহজে ধরা যায় না, তাঁহার মুখের কথাও তেমন শুধু শুনিয়াই ধারণা করা যায় না। আমরা না বুঝিয়াছি সে মানুষিটিকে, না বুঝিয়াছি তাঁহার সে কথা। যে সাধনা ও একাগ্রতা থাকিলে তাঁহার কথার নিগূঢ় তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করা যায়—তাহা যে আমাদের নাই।
তিনি বলেন—একেবারে কিছু না বুঝিতে পারাই সবচেয়ে ভাল বুঝা। অজ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান।
২
বাংলাদেশের এক অপ্রসিদ্ধ গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জনক-জননী ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও নিষ্ঠাবান। শৈশবেই তাঁহার স্বভাবের মধ্যে ভবিষ্যৎ জীবনের আভাস প্রকাশ পায়। লেখাপড়ায় বিশেষ অনুরাগ না থাকিলেও অন্তর্জাগতিক বোধের উন্মেষ ছিল অসাধারণ। দৈহিক বিষয়ে ঔদাসীন্য, কিন্তু অন্তর্জগতের প্রতি অদ্ভুত আকর্ষণ।
৩
স্বভাবের কোলেই ভাবের শিশু বর্ধিত হইতে লাগিল। শত অভাবেও স্বভাব আঁকড়াইয়া থাকাই ছিল জীবনের মূলমন্ত্র। সুখ-দুঃখের দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ থাকা—এই ছিল তাঁহার যোগসাধনা। যিনি দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে, তিনিই প্রকৃত যোগী।
৪
যৌবনে পদার্পণ করিয়া আপনা হইতেই যোগাভ্যাস আরম্ভ। পরে তেজোদীপ্ত গুরুদেবের আগমন। জন্মান্তরের সংস্কারে দিব্যজ্ঞানোন্মেষ দ্রুত ঘটিল। সদগুরুর কৃপায় হৃদয়ের দ্বার উন্মুক্ত হইল।
৫
স্বপ্নযোগে সিদ্ধমন্ত্র লাভ। কঠোর তপস্যা। পর্বত-অরণ্য-তীর্থ ভ্রমণ। বহু মহাত্মার সাক্ষাৎ। কামনা-বাসনা দগ্ধ হইয়া জীবন্মুক্ত অবস্থা লাভ। অধিকাংশ সময় অপ্রাকৃত চেতনায় অবস্থান।
৬
বার্ধক্যে উপনীত হইলেও বালভাব অক্ষুণ্ণ। মাধুর্য, সরলতা, আকর্ষণ আজও অপরিবর্তিত। শাস্ত্রবাক্য সত্য—স্বভাবের নাশ হয় না।
হে সুন্দর, হে মধুর—তোমার মূর্তি চিরদিন জাগ্রত থাকুক।
৭
জীবের মঙ্গলচিন্তা—তাঁহার হৃদয়ের প্রধান ভাবনা। মিথ্যার আবরণ ছিন্ন করিয়া শুদ্ধ সত্য উদ্ধার করাই ধর্ম। তিনি কাঙ্গালের বেশে দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া বেড়ান—শুধু ধর্মবীজ বপনের জন্য।
৮
তাঁহার বাণী গভীর, অথচ সহজ। উপনিষদ ও গীতার সারাংশ সহজ ভাষায় প্রকাশ করেন। পৌরাণিক আখ্যানের অন্তর্লীন মহাসত্য তিনি রূপক সরাইয়া ব্যাখ্যা করেন।
৯
শান্তি লাভের উপায়—নিত্য বস্তু বা স্বভাবের সঙ্গ। যাহাকে ত্যাগ করা যায় না—তাহাই নিত্য। প্রাণ নিত্য। সর্বাশ্রয়ে ভগবানের আশ্রয় গ্রহণই ধর্ম।
“আশ্রয় লইয়া ভজে তারে কৃষ্ণ নাহি ত্যাজে।”
“সর্বলোকপ্রতিষ্ঠা।”
১০
কর্তৃত্বাভিমানই দুঃখের মূল।
“অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে।”
মানুষ যন্ত্রীর হাতে যন্ত্রমাত্র। প্রারব্ধ কর্মের ফল অনুদ্বিগ্নচিত্তে ভোগ করিতে হয়। ধৈর্যধারণই যোগ।
১১
যাহা উদয় হয় ও লয় পায়—তাহা ত্যাজ্য। গুরু বাক্যই সত্য। গুরু দিব্যচক্ষু দান করিলে নিত্যানিত্যবিবেক জাগে।
“চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।”
১২
তাঁহার সহিত কি সম্বন্ধ জানি না। জানিবার প্রয়োজনও হয় নাই। শুধু ইচ্ছা হয় প্রাণভরিয়া ভালবাসিতে। তাঁহার স্মৃতি হৃদয়ে চির অঙ্কিত।
“তুয়া চরণে মন লাগই রে।”
জন্মে জন্মে যেন শ্রীচরণের দাসানুদাস হইতে পারি।
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
February 12, 2026
Rating:





.jpg)
No comments: