যাদবপুরে শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম প্রতিষ্ঠা | শ্রীশ্রী রামঠাকুরের করুণাময় লীলা ও এক ঐতিহাসিক অধ্যায়
জয়রাম 🌺🙏
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন আশ্রমের মধ্যে যাদবপুর শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বহন করে। এই আশ্রম কেবল একটি উপাসনাস্থল নয়, বরং শ্রীশ্রীঠাকুরের ইচ্ছাশক্তি, ভক্তদের আত্মনিবেদন এবং গুরুকৃপার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
পত্রের মাধ্যমে আশ্রম প্রতিষ্ঠার নির্দেশ
বাংলা ১৩৪৯ সনের মাঘ মাসে শ্রীশ্রীঠাকুর একটি পত্রের মাধ্যমে সংবাদ দেন যে, কলকাতার উপকণ্ঠে যাদবপুরে ১৩ই ফাল্গুন তাঁর পাহাড়তলী শ্রীশ্রীকৈবল্যধামের শাখা আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি ভক্তদের আগেভাগেই উপস্থিত হয়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠার কাজে অংশগ্রহণের নির্দেশ দেন।
এই সংবাদে সকল ভক্তের মনে আনন্দের সঞ্চার হয় এবং আশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি শুরু হয়।
আশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা
এই মহৎ কর্মযজ্ঞের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুরের একনিষ্ঠ ভক্ত, খ্যাতনামা চিকিৎসক ডা. যতীন্দ্র মোহন দাশগুপ্ত এবং তাঁর সহধর্মিণী।
তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা উৎসব অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়।
মহোৎসবের আনন্দ
তৎকালীন সময়ে যাদবপুর ছিল তুলনামূলকভাবে নির্জন এলাকা। তবুও নানা স্থান থেকে বহু ভক্ত উপস্থিত হন। কীর্তন, সত্যনারায়ণের প্রসাদ এবং অন্নভোগে ভক্তদের মধ্যে এক অপূর্ব আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
ফেণীর ভক্ত যামিনী কুমার সাহা মহোৎসবের রান্না ও সেবায় বিশেষ পরিশ্রম করেছিলেন।
ভক্তদের একমাত্র আক্ষেপ
উৎসব অত্যন্ত আনন্দময় হলেও একটি বিষয় সকলের মনকে ব্যথিত করেছিল। শ্রীশ্রীঠাকুরের পূর্ব নির্দেশ অনুসারে কোনো ভক্তই তাঁর কাছে দর্শনে যাওয়ার সাহস করেননি।
সেই সময় তিনি কলকাতার ১১ নং আর্ল স্ট্রিটে ভক্ত কুঞ্জলাল মজুমদার মহাশয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
এমনকি আশ্রম প্রতিষ্ঠার দিনেও তিনি আশ্রমে উপস্থিত হননি। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আগত বহু ভক্ত গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়েন।
দর্শনের আকাঙ্ক্ষা
“ঠাকুরের দর্শন পাব না জানলে এত দূর থেকে এই উৎসবে আসতাম না।”
এমন কথাও অনেক ভক্তের মুখে শোনা যায়।
অবশেষে ঠাকুরের সম্মতি
উৎসবের পরদিন লেখক পরিবারসহ কুঞ্জবাবুর বাড়িতে গিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুরের দর্শন লাভ করেন। সুযোগ পেয়ে তিনি বিনীতভাবে প্রার্থনা করেন—
“আপনি যদি অন্তত কিছুক্ষণের জন্য আশ্রমে যান, তবে সকল ভক্ত আনন্দে ধন্য হবেন।”
ভক্তদের আন্তরিক আকুলতা অনুভব করে শ্রীশ্রীঠাকুর আশ্রমে যাওয়ার সম্মতি প্রদান করেন এবং সবাইকে আবার উৎসবস্থলে ফিরে যেতে বলেন।
ঠাকুরের আগমনে আনন্দের বন্যা
ঠাকুর আসছেন—এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই উৎসব প্রাঙ্গণে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে তিনি মোটরগাড়িতে করে আশ্রমের সামনে উপস্থিত হন।
সকল ভক্ত তাঁর শ্রীচরণ দর্শন ও স্পর্শ করে নিজেদের ধন্য মনে করেন। যদিও তিনি গাড়ি থেকে নামেননি, তবুও তাঁর এক ঝলক দর্শনেই সকলের মন পূর্ণ হয়ে যায়।
এরপর তিনি পুনরায় তাঁর বাসস্থানে ফিরে যান এবং ভক্তরা প্রসাদ গ্রহণ করে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হন।
শ্রীশ্রীকৈবল্যধামের নামকরণ
এই নতুন আশ্রমের নামও রাখা হয় “শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম”।
শ্রীশ্রীঠাকুর ডা. যতীন্দ্র মোহন দাশগুপ্ত, শ্রীমণীন্দ্র কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-কে এই আশ্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
এই ঘটনার আধ্যাত্মিক শিক্ষা
১. গুরুর ইচ্ছাই সর্বোচ্চ
সদ্গুরুর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে গভীর আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য থাকে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সবসময় উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
২. ভক্তের আন্তরিক প্রার্থনা বৃথা যায় না
ভক্তদের আকুল আবেদন ও আন্তরিকতার প্রতিদান স্বরূপ শ্রীশ্রীঠাকুর শেষ পর্যন্ত তাঁদের দর্শন দিয়েছিলেন।
৩. দর্শনের চেয়েও বড় গুরুকৃপা
ঠাকুর গাড়ি থেকে না নামলেও তাঁর এক ঝলক দর্শনই ভক্তদের হৃদয় পরিপূর্ণ করে দিয়েছিল। এতে বোঝা যায়, গুরুকৃপা বাহ্যিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না।
উপসংহার
যাদবপুরে শ্রীশ্রীকৈবল্যধামের প্রতিষ্ঠা শ্রীশ্রী রামঠাকুরের লীলাজীবনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়—সদ্গুরুর ইচ্ছার প্রতি পূর্ণ আস্থা, নিষ্ঠা ও আত্মসমর্পণই ভক্তির মূল ভিত্তি। তাঁর কৃপা লাভের জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং অটল বিশ্বাস।
জয়রাম 🌺🙏
তথ্যসূত্র: শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্রদেব স্মরণে — শুভময় দত্ত।
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
জুলাই ১৫, ২০২৬
Rating:






.jpg)
কোন মন্তব্য নেই: