শ্রীশ্রী রামঠাকুর — জীবন সংঘাত ও অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
নীচের অংশে কবির বর্ণিত শ্রীশ্রী রামঠাকুরের একটি জীবনকাহিনি তুলে ধরা হল — গুরুভক্তি, অদ্ভুত ঘটনার বর্ণনা ও মানুষে শেখানো উপদেশের অনুষঙ্গ।
শুরু — বিক্রমপুর (ডিঙ্গামানিক)
রামঠাকুরের বাড়ী বিক্রমপুর (ডিঙ্গামানিক)। বয়স ছিল মাত্র ২৬/২৭ বৎসর। তাঁর মুখে শোনা যায় যে — তাঁর গুরুদেব একজন প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক ছিলেন। যখন রামঠাকুরের বয়স আট বছর, তখন গুরুদেব মৃত্যুমুখে তাঁকে বলেন যে, রামঠাকুরের সঙ্গে তাঁর আবার সাক্ষাৎ হবে। কথাটি শুনে বালকের মনে এক বিপ্লব উপস্থিত হয়।
মৃত ব্যক্তির সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ—এর অর্থ কি? বালক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি, তবে তাঁর প্রাণে উদ্যম সঞ্চারিত হলো। পড়াশোনায় মন না থাকার ফলে তিনি বারো বৎসর বয়সে গৃহত্যাগ করে নানা স্থানে সন্ন্যাসীর সঙ্গে ভ্রমণ শুরু করলেন।
সন্ন্যাসী ও গুরুদেবের দেখা
একদিন কামরূপের কামাখ্যা দেবীর মন্দির থেকে বেরিয়ে আসার সময় পাশে থেকে কেউ বলল — “তুই আমার গাঁজা সাজাইয়া দিয়া যা।” ফিরিয়েই তিনি দেখলেন একজন সন্ন্যাসী। চোখে দেখা হলে ওই কণ্ঠস্বরই তাঁর গুরুদেবের কণ্ঠ—রামঠাকুর বুঝলেন।
পরে বহু বছর তিনি হিমালয় ভ্রমণ করে মহাত্মাদের কলেবর পরিবর্তন ইত্যাদি বহু অদ্ভুত ব্যাপার দেখেন। তাঁর গুরুদেব তাঁকে তাঁর মাতার মৃত্যু পর্যন্ত সংসারাশ্রমে ফেরত পাঠান।
নোয়াখালীর ঘটনা ও লোকমুখে কাহিনি
রামঠাকুর নোয়াখালী এসে একজন ওভারসিয়ারের পাচক হয়েছিলেন। গল্প উঠল—এক দিন তিনি আহ্নিকে বসিয়েই হঠাৎ বললেন, “আহা, অমুকের শিশুপুত্রটি মারা গেল।” বাস্তবিকভাবে ঠিক সেই সময়ে অন্য স্থানে সেই শিশুটির মৃত্যু ঘটে।
লোকেরা বলত—কখনও তাঁকে গৃহে দেখা যায়, পরের মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যান; রাত্রিশেষে রক্তচন্দন-চর্চ্চিত অবস্থায় কোনো বৃক্ষ থেকে অবতরণ করেও দেখা গেছে। সর্প দংশন, গরুর-মহিষের হামলা—এসব বাধায় তিনি অদৃশ্যভাবে চলে গেছেন বা নিবারণ করেছেন। নিজে প্রায় কিছুই ভক্ষণ করতেন না; কদাচিৎ দুগ্ধ বা ফল গ্রহণ করতেন—তবু ছিলেন সুস্থ।
মানুষের বিপদে তাঁর পরামর্শ ও পরোয়ানা ছাড়াই তিনি সহায়তা করতেন; পাবলিক ওয়র্ক প্রভুদেরও তিনি যত্নে রাঁধি খেতে দিতেন এবং মাতালদের মায়ের মত সেবাও করতেন।
কালের এক মিনিট — মসজিদে দৃশ্য
একবার ভবানীগঞ্জে স্টিমারে উঠতে গিয়ে তিনি একটি আত্মীয়কে স্টিমারে তুলে দিয়ে রাত্রে একটি মসজিদে আশ্রয় নেন। গভীর রাত্রে তিনি দেখেন মসজিদ আলোকিত, এবং তাঁর গুরুদেব ও দুইজন সন্ন্যাসী তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। গুরুদেব জানালেন তারা কৌশিকী পর্বত থেকে চন্দ্রনাথ আসছিলেন; নির্জন স্থানে তাদের দেখা হলে তিনি ভীত হয়েছিলেন—তাই তারা তাঁকে দেখতে আসেন।
ক্রমশঃ
জয় শ্রীশ্রী রামঠাকুর। (উৎস: কবিবর নবীনচন্দ্র সেন লিখিত — আমার জীবন, চতুর্থ ভাগ: প্রচারক না প্রবঞ্চক)
নাম ও প্রাণতত্ত্ব — শ্রীশ্রী রামঠাকুরের নির্দেশনা
নামের গুরুত্ব এবং প্রাণকে স্থির করে নাম-জপে ভগবানের অস্তিত্ব উপলব্ধির সহজ, কিন্তু গভীর শিক্ষা—নীচে ঠাকুরের বলিষ্ঠ বাণী ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া হল।
“ভগবানের সেবা-পরিচর্যাই ধৈর্য্য ধরিয়া নামের নিকট সর্ব্বদা থাকা। যেই নাম সেই ভগবান। যদি নামই ভগবান হইল, তবে যেখানে নাম হয় সেইখানকেই বৃন্দাবন বলিতে হয়। ব্রজবাসীর কোন কর্ম্মে বেদ বিধির প্রয়োজন হয় না। ভ্রমবশতঃ কর্তা হইয়া, ভগবানকে ছাড়িয়া অপূর্ণ কামের দ্বারা আবৃত হইয়া নানা উপাধির সৃষ্টি করিয়া শান্তি ও অশান্তির যোগে পড়িয়া সুখী দুঃখী হয়। অতএব সর্ব্বদা নামের আশ্রয় নিয়া সকল কার্য্য যথাসম্ভব করিয়া যাইবেন, মন স্থির হউক আর চঞ্চল হউক। সুখী না হইলেও নাম করিতে ভুলিবেন না।”
— শ্রীশ্রী রামঠাকুরঠাকুর এখানে বলছেন — ভগবানের সেবা ও পরিচর্যার মাধ্যমে ধৈর্য ধারণ করে নামের নিকটে অবস্থান করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নাম ও ভগবানের সম্পর্ক এমন যে, নাম যেখানে থাকে সেখানে ভগবান ও উপস্থিত — সেই স্থানকেই বৃন্দাবন বলা যায়। বাহ্যিক বিধি বা আচার-অনুষ্ঠান ছাড়াও যে স্থান নামের মাধ্যমে পবিত্র হয়েছে, সেখানে আর অতিরিক্ত বিধি প্রয়োজন পড়ে না।
ঠাকুরের আর অন্য পত্র থেকে উদ্ধৃত ব্যাখ্যা:
"প্রাণ, অর্থাৎ, যাহা শ্বাস-প্রশ্বাস চলিয়া থাকে, ইহাই ভগবান। ইহাকেই স্থির করিয়া যতটুকু সময় রাখা যায়, ততটুকু সময়ে ভগবানের নাম জপ করা হয় ... এই স্থির অবস্থায় ভগবান (অভাবশূন্য) জ্ঞান প্রজ্বলিত হয়।"
এখানে প্রাণকে বলা হয়েছে জীবনের বস্তু—শ্বাস-প্রশ্বাস; যখন প্রাণকে নিয়ন্ত্রণ করে স্থির করা যায়, তখনই সেই সময় নাম-জপ বাস্তবে কার্যকরী হয়। স্থিরপ্রাণ হলে সেটাকেই স্থির আত্মা বলা যায়—এটাই চর্চার লক্ষ্য।
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নাম-জপের জন্য ১০–২০ মিনিট নির্ধারণ করুন — প্রথমে আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে সময় বাড়াবেন।
- শ্বাস-প্রশ্বাসে মন আনুন — প্রতিটি নিশ্বাসে নাম মেলেরভাবে মনকে স্থির করার চেষ্টা করুন (প্রাণ-স্থিরকরণ অনুশীলন)।
- দৈনন্দিন কাজের মধ্যে নামকে লীলে রাখুন — হাঁটার সময়, কাজে বিরতি, কিংবা বিশ্রবে নাম স্মরণ করুন।
- নামকে উপাধি বা বাহ্যিক পরিচয়ের বাইরে রেখে অভ্যন্তরীণ স্থিতি গড়ুন—উপায় নয়, আত্মার উপস্থিতি ধরাই লক্ষ্য।
ঠাকুরের বক্তব্য আমাদের স্মরণ করায়—বহু সামাজিক পরিচয়, উপাধি ও রীতি কালের সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত; কিন্তু নাম-ভিত্তিক অভিজ্ঞতা স্থায়ী। তাই নামকে শুধু উচ্চারণ নয়, জীবনের স্থিরত্ব ও আচরণে রূপান্তরিত করা জরুরি।
ঠাকুরের কৃপাধারা — হিন্দু–মুসলমান ভেদহীন ভক্তি
হিন্দু ও মুসলমানের কোনও ভেদ বা বিচ্ছেদ ঠাকুর কখনই মানেননি। সকল ভক্তকে তিনি সমভাবে ভালোবাসতেন — উৎসব, নামকীর্তন ও আনন্দোৎসবে মুসলমান ভক্তরাও সমান উৎসাহে অংশ নিতেন এবং ঠাকুরের উপস্থিতি তাঁদের ভক্তিভাবে অনুপ্রাণিত করতো।
চেরাগ আলির জীবনে একদিন ঠাকুরের কৃপাধারা অহেতুকভাবেই নেমে আসে। ঠাকুর তখন ভক্তসমেত ডিঙামানিক এসেছেন। নাম–কীর্তন, আনন্দ ও উল্লাসে চারপাশ মুখর।
ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন হওয়াতে চেরাগ আলি পুকুরপাড়ে বসে ঠাকুরের ধ্যান করছিলেন। হঠাৎ অন্তর্যামী ঠাকুর এক ভক্তকে বললেন—
“চেরাগ আলি পুকুরের ধারে বসে আছে, তাকে ডেকে আনুন।”
ভিড় ঠেলে তাঁকে ঠাকুরের কাছে আনা হল। ঠাকুর সপ্রেমে তাকে পাশে বসালেন—
“একি? আমার বাড়িতে এসে বাইরে বসে আছেন কেন? আপনি কি আমার পর? আপনার সঙ্গে তো আত্মীয়তা আছে—আপনি তালৈ হন।”
এই কথায় চেরাগ আলির চোখ ভেজা। ঠাকুর তাঁকে নামমন্ত্র দিলেন। বিস্ময়ে তিনি দেখলেন—
এই একই মন্ত্র তিনি কিছুদিন আগে স্বপ্নে পেয়েছিলেন!
বাহিরে বেরিয়ে চেরাগ আলি তখন এক নতুন মানুষ—দেহ পুলকে ভরা, চোখ অশ্রুসজল, প্রেমের আবেগে কাঁপিতেছেন। তিনি সারাক্ষণ নাম জপে নিমগ্ন হয়ে থাকেন।
ডিঙামানিকে ঠাকুরের জন্মোৎসব। হাজার হাজার ভক্ত ভিড়। সেদিন ডক্টর ইন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় দেখলেন—এক মুসলমান চাষী গাছতলায় বসে হাতে একটি পুঁটলি।
জিজ্ঞেস করে জানা গেল—শুধু ঠাকুরকে নিবেদন করার জন্য সে এনেছে—
- কয়েকটি আম
- কলা
- আর কিছু পরিমাণ চাল
কিন্তু এত ভিড় দেখে ভিতরে ঢুকতে সাহস হয়নি।
ইন্দুবাবু তার ভোগ ঠাকুরের কাছে পৌঁছে দিয়ে সেই নিরহঙ্কার মানুষের সঙ্গে কথা বললেন।
লোকটি বলল—
“কর্তা, আমি আর ঠাকুর একই বয়সী, ছোটবেলায় একসঙ্গে ডাণ্ডাগুলি খেলেছি। পরে বহুবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে।”
ইন্দুবাবু প্রশ্ন করলেন—
“তাঁকে এত দেখলে, কিছু বুঝলে?”
চাষীর উত্তর—
“এসব মানুষ আসে ঝিলিকের মত, আবার ঝিলিকের মত চলে যায়। কাউকে বোঝা যায় না।”
“তবে তাঁর কাছে আসতে কেন? দেখতেই বা কেন?”
“ভাল লাগতো। তাঁর কথা শুনতে ভাল লাগতো—তাই আসতাম।”
ইন্দুবাবু আবার প্রশ্ন করলেন:
“তুমি মুসলমান। এই আম–কলা–চাল দান করলে তোমার গুনাহ হবে না?”
চাষীর নির্লিপ্ত উত্তর—
“গুনাহ হবে কেন কর্তা? তিনি তো হিন্দুও নন, মুসলমানও নন। উঁচু টিলায় দাঁড়ালে যেমন নীচের সব সমান দেখা যায়, ঠাকুরও ঠিক সেই উঁচু টিলায় বসে আছেন।”
সকলেই বিস্মিত হলেন—এক নিরক্ষর চাষীর মধ্যে এমন গভীর উপলব্ধি! ঠাকুরের কৃপা ছাড়া এই উপলব্ধির জন্ম অসম্ভব। বহু ‘শিক্ষিত’ ভক্তও এই সত্য উপলব্ধি করতে পারেন না।
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
December 02, 2025
Rating:








.jpg)
No comments: