অদ্ভুত অলৌকিক উপস্থিতি — শ্রীশ্রী রামঠাকুরের দয়া
সন্ধ্যার সময় শ্রীশ্রীঠাকুর চাদরখানা সরিয়ে উঠে বসলেন। আমরা সকলে প্রণাম করলাম। ঠাকুরকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। মা প্রশ্ন করলেন—
“বাবা, আমাদের কোনো অপরাধ হয়নিতো? আপনি দুপুরে ভোগ গ্রহণ করলেন না কেন?”
ঠাকুর শান্তভাবে বললেন—
“আমি ভোগ গ্রহণ করেছি। তবে সব জায়গাতেই দেখতে হয়।”
এই কথার অর্থ কেউ তখন বুঝতে পারেননি।
উৎসব শেষে ঠাকুর মতিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের বাড়িতে গেলেন। তিন–চার দিন পর দীনেশচরণ বসু মহাশয় একটি চিঠি দেখালেন। চিঠিটি এসেছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বহর গ্রাম থেকে—দীনেশবাবুর পিতা শ্রীকান্ত বসুর লেখা।
“বিগত রামনবমী উৎসব বিশেষ আনন্দের সঙ্গে সম্পন্ন হইয়াছে। উৎসবের দিন বেলা ১২টা নাগাদ শ্রীশ্রীঠাকুর অপ্রত্যাশিত ভাবে আসিয়া উপস্থিত হন এবং তিন-চার ঘন্টা অবস্থান করেন। অপরাহ্নে আমরা তাঁহাকে কলিকাতা যাত্রার জন্য বহর স্টেশন হতে স্টীমারে তুলিয়া দেই।”
চিঠিতে ঠাকুরের কলকাতা পৌঁছানোর সংবাদ জানাতেও নির্দেশ ছিল।
চিঠিটি পড়ে সকলেই বিস্মিত—কারণ একই সময়ে কলকাতায় ভোগ না গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে মা প্রশ্ন করেছিলেন, আর সেই সময়ই বহর গ্রামে ঠাকুর ছিলেন!
ভক্তরা বিষয়টি ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সংক্ষিপ্তে বললেন—
“এই রকম তো হইয়া থাকে।”
এরপর আর কিছুই বললেন না। দয়াল গুরু—ভক্তের ডাকে করুণা করে তিনি যে কোনও স্থানে উপস্থিত হতে পারেন—এই সত্য আবারও প্রতিষ্ঠিত হল।
শ্রীশ্রীঠাকুর: শান্তির গহ্বর ও কঠোর দৃষ্টির রহস্য
সাধারণ দৃষ্টিতে শ্রীশ্রীঠাকুর ছিলেন অতি শান্ত। ভক্তগৃহে, উৎসব-সমারোহে ধীর, স্থীর ও নির্বিকার চলাফেরা করতেন। সর্বদা সংযত ভাব—বাহ্য জগৎ কতোই না তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ, ঠাকুর ছিলেন মহাসমুদ্রের তলদেশের ন্যায় শান্ত ও স্থির।
ভক্ত ও দর্শনার্থীগণ অনেক ধরনের প্রশ্ন করতেন—স্বার্থ-পরার্থ, কৌতূহল বা দুঃখ-ব্যথা; ঠাকুর ধৈর্য্য সহকারে প্রত্যেকটি প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিয়ে তাঁদের সংশয় ভঞ্জন করতেন। অমায়িক ব্যবহার ও স্নেহমাখা সম্বোধনে তিনি উপস্থিতদের অন্তরে যেন পরম শান্তির প্রলেপ দিয়ে দিতেন।
আবার এই চিরক্ষমাশীল ও স্নেহপ্রাণ ঠাকুরও কঠোর ও নির্মম ব্যবহার করতেন—যা কেহ প্রত্যক্ষ না করলে বিশ্বাস করতে চাইত না। কেন তিনি এমন হতেন, সাধারণের বুদ্ধির অগম্য। ঠাকুরের অন্তর্দৃষ্টি যা দেখত ও বুঝত, তা অপরের পক্ষে অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব। তিনি শ্রীমুখে যেমন বলতেন, 'প্রাক্তনের ভোগদান করতেই হবে', কার্যতেও তিনি প্রিয় ভক্তের বিপর্যয়কালে অবিচলিত থাকতেন। যার উপর আমরা কঠোর বলতাম, সত্যদ্রষ্টার দৃষ্টিতে সেই কঠোরতা ন্যায় ও কল্যাণবৎ প্রতিভাত হত।
অতএব বহুকাল মনে হয় আমরা বাহ্যিকভাবে যে ঠাকুরকে দেখতাম, তিনি তার অনেক উর্ধ্বে অন্তর্লোকে বাস করতেন। শ্রীশ্রীঠাকুর সম্পর্কে এই বৈষম্যের প্রকৃত মর্ম আমার পক্ষে পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব নয়।
একটি ভক্তের স্মৃতি
এ স্থলে একটি ভক্তের কথা উল্লেখ করছি—যেটিকে আদি ভক্তগণের অন্যতম বলা যায়। তিনি সুদীর্ঘকাল পরম নিষ্ঠার সঙ্গে ঠাকুরের সেবা করেছেন। তার ইষ্টনিষ্ঠা, সেবাপরায়ণতা ও তন্ময়তা দেখে আমরা শ্রদ্ধাবান ছিলাম।
ভক্তটি অত্যন্ত দারিদ্যের কষ্টে নিপীড়িত ছিলেন। ঠাকুর মাঝে মাঝে ওই ভক্তের গৃহে পদার্পণ করতেন—ইহাতে দরিদ্র ভক্ত দুঃখ ভুলে আনন্দে অধীর হতেন এবং ঠাকুরের তৃপ্তির জন্য সাধ্যানুসারে অনেক কিছু করতেন। ঠাকুর গল্প-গুজব ও উপদেশে ভক্তের হৃদয় সঞ্জীবিত রাখতেন।
কিন্তু বহুদিন পর সবকিছু যেন পাল্টে গেল। ঠাকুর আর ওই ভক্তের গৃহে যেতেন না। বহু অনুরোধে ও আকুল প্রার্থনায়ও ঠাকুর তার দিকে নন—কখনো তাকিয়েও দেখতেন না, তার কোনো প্রশ্নের উত্তরও দিতেন না। অন্যান্য ভক্তেরা বিষয়টি লক্ষ্য করে ব্যথিত হয়ে দরিদ্র ভক্তকে ক্ষমা করার জন্য অনুরোধ করেন, তবু কোনো ফল হল না।
ঠাকুরের এমন ভাবই যেন—কানে কিছুই শোনেননি। এই ভক্তটি জীবিতকালে ঠাকুর আর তার গৃহে যাননি; তিনি ঠাকুরের দেহত্যাগের পূর্বেই পরলোকগমন করেন।
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
December 02, 2025
Rating:






.jpg)
No comments: