পরম প্রেমময় শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর এর
লীলা অমৃত 

প্রভাতচন্দ্র, স্বর্গীয় অতুলচন্দ্র ও স্বর্গীয় বীরেন রায়ের
সমবেত নাম-কীর্তনে অগ্নিকান্ড
স্বর্গীয় অতুলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় অবসর জীবনযাপন করছেন তার কালীঘাটের মুখার্জী পাড়া লেনের বাসাবাটিতে। সেটা হল বিংশ শতাব্দীর বিশ দশকের মাঝামাঝি। ঐ সময়ে ঠাকুর মহাশয় ঘুরে ফিরে অনেক সময়ই তার বাসায় অবস্থান করতেন। সেদিনগুলি অতুলচন্দ্রের কাটত ঠাকুর মহাশয়ের সান্নিধ্যে ও পরমানন্দে। এ কলকাতা শহরে তার বাসা ছেড়ে ঠাকুর মহাশয় অন্যত্র কোথায় গেলেও অতুলবাবু প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় সেই সকল স্থানে উপস্থিত হতেন। ঠাকুর মহাশয়ের সঙ্গলাভ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখতেন না, প্রভূত আনন্দই পেতেন। কলকাতা শহর ছেড়ে ঠাকুর মহাশয় অন্যত্র গেলে তাঁহার সান্নিধ্যলাভ করতে না পারার জন্য অতুলবাবু মনঃকষ্টে ভুগতেন।
অনেক ভেবে চিন্তে তিনি একদিন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতির আশুতোষ অধ্যাপক স্বর্গীয় ডক্টর প্রভাতচন্দ্র চক্রবর্তীকে তার মানসিক অবস্থার কথা খুলে বললেন। তিনি প্রস্তাব করলেন যে, যেহেতু সকালে তাদের পক্ষে সম্ভবপর নয়, প্রতিদিন বিকালে ঠাকুর মহাশয়ের পটের সামনে যদি একটু নাম-সংকীর্তন করা যায় তাহলে নাম ও ঠাকুর মহাশয় অভিন্ন বলে তাঁহার সান্নিধ্যলাভের আনন্দ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।
উত্তম প্রস্তাব। প্রভাতচন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে জানালেন তার সানন্দ সম্মতি। ঐ ঘরেই বসেছিলেন তখন বয়সে তরুণ, চৌরিঙ্গী রোডের মুয়ির মিলের "শো-রুমের" কর্মচারী, স্বর্গীয় বীরেন রায়। অতুলবাবুর প্রস্তাব শুনে ধীরেনবাবু লাফিয়ে উঠলেন, বললেন, দাদা আজই আমি অফিস ফেরৎ একজোড়া করতাল কিনে আনব। সুতরাং স্থির হল সেদিন সন্ধ্যা থেকেই শুরু হবে অতুলবাবুর গৃহে নাম-সংকীর্তন।
অতুলবাবুর বাসাবাড়ীটি ছিল টিনের। ঘরের মধ্যখানে একটি কাঠের ফ্রেমে ঠাকুর মহাশয়ের সেই সময়ে প্রচলিত একখানি ছোট পট টাঙিয়ে দেওয়া হল। আর একটি লণ্ঠন বেঁধে দেওয়া হল একটি আড়া বাঁশে যাতে আলো ঠিক গিয়ে পড়ে পটের উপরে। তাদের সম্বল শুধু একজোড়া করতাল। বীরেন রায় করতাল বাজান সুরের সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে। অতুলবাবু, প্রভাতচন্দ্র ও বীরেন রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় কীর্তনে মগ্ন হয়ে থাকতেন। তাদের কীর্তনে সুর-সঙ্গতি না থাকলেও বিপুল আনন্দে তাহা ছিল সার্থক।
প্রতিদিনের মত ঐ তিনজন সায়ংকালে সেদিনও কীর্তন করছিলেন ঘরের দরজা বন্ধ করে, পাছে অন্য কাহারও আগমনে তাদের আনন্দ বিঘ্নিত হয়।
লণ্ঠন জ্বালানোর বা টাঙানোর সেদিন কোথাও বোধ করি বড় রকমের একটি ত্রুটি হয়েছিল। কীর্তন যখন পূর্ণোদ্যমে চলছে, তারা তিনজন কীর্তনে বিভোর এমন সময়ে সহসা প্রজ্বলিত আগুন নিয়ে লন্ঠনটি বীরেন রায়ের গায়ে পড়ল।
ঘর তখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, "সর্বনাশ, গেল গেল, বীরেন রায় পুড়ে মরল,"
এই চিৎকার উঠল।
তাদের চিৎকারে বাড়ীর ভিতর থেকে আলো নিয়ে অতুলবাবুর পরিজনেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন, অন্ধকারের মধ্যে অতুলবাবুই গিয়ে দরজা খুললেন। তাদের আনা আলোতে দেখা গেল যে অনেক দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছিল লণ্ঠনটি আড়াবাঁশের সঙ্গে। লণ্ঠনের পলতেটা বোধ হয় বেশী বাড়ান থাকায় ঐ দড়িতে আগুন ধরে এবং দড়ির অনেকাংশ পুড়ে যাওয়ার পরে ঐ প্রজ্বলিত লণ্ঠনটি বীরেন রায়ের গায়ে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্য্য বীরেনবাবুর গায়ে কোন আঁচ লাগেনি। তার-জামা-কাপড় পুড়ে যাওয়ার চিহ্নমাত্র ছিল না। যদিও প্রভৃত ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, এই অগ্নিকান্ডে কাহারও কোন ক্ষতি হয়নি। সকলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
প্রভাতচন্দ্র পরিহাস করে বললেন,
অতুলবাবুকে, দাদা,
অগ্নি সর্বভুক ঠিকই কিন্তু বীরেন রায়ের রঙ এত কাল যে, তা অগ্নিরও অস্পৃশ্য"।
অতুলবাবু, প্রভাতবাবু সস্নেহে বারংবার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে লাগলেন বীরেন রায়কে।
অতুলবাবুর মুখার্জী পাড়া লেনের বাসাবাটিতে যেদিন সন্ধ্যার পরে ঐ অগ্নিকান্ডটি ঘটে সেদিন ঠাকুরমহাশয় ছিলেন পূর্ণিয়া শহরে এক আশ্রিতের গৃহে। রাত্রি আটটা নাগাদ ঠাকুরমহাশয়ের সামনে তাঁহার ভোগের জন্য সামান্য সামগ্রী এনে রাখলেন ঐ গৃহের কর্ত্রী।
ঠাকুর মহাশয় বললেন,
"আজ থাক।
কিছু গ্রহণ করতে তিনি অপারগ।
আঙ্গুল দিয়ে ভোগ্যবস্তু স্পর্শ করতে তিনি অক্ষম।"
কী কারণ, গৃহস্বামী জানতে চাইলে ঠাকুর মহাশয় দগ্ধ হাত দু'টি প্রসারিত করে দিলেন তার সামনে। যারা তাহার সামনে দাড়িয়ে ছিলেন তারা ভীত হয়ে উঠলেন। ভাবলেন কী করে ঠাকুর মহাশয়ের হাত দু'খানি এমন অগ্নিদগ্ধ হলো।
এ ঘরে জ্বালানো যে বাতি সে তো ঠাকুর মহাশয় যেখানে আছেন সেখান থেকে অনেক দূরে, ঠাকুর মহাশয় কী কোন সময় ঐ বাতি স্পর্শ করতে গিয়ে হাত দু'খানি এমন অগ্নিদগ্ধ করেছেন। না তাও তো নয়। অপরাহ্নে ঠাকুর মহাশয় আপন শয্যা ছেড়ে একবারও ওঠেননি। সম্মুখে যারা আছেন তারা সকলেই জানেন। তবে কী করে এই দুর্ঘটনা ঘটল?
ঠাকুর মহাশয় তখন সংক্ষেপে জানালেন অতুলবাবুর গৃহে কীর্তনের কথা এবং আগুন নিয়ে জ্বলন্ত লণ্ঠনটি বীরেনবাবুর বুকে পড়ার ঘটনাটি।
বীরেনবাবুকে আগুনের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে ঐ জ্বলন্ত লণ্ঠনের আগুনে তাহার হাত দু'খানি দগ্ধ হয়েছে।
কথাটি বলছেন স্বয়ং ঠাকুর মহাশয় কিন্তু শ্রোতারা বিশ্বাস করেন কী করে?
সেদিন সকালবেলা ঘন্টা তিনেকের জন্য প্রাতঃভ্রমণে বাহির হওয়া ছাড়া ঠাকুর মহাশয় তারপর আর ঐ বাড়ী থেকে বের হননি। অতুলবাবুর বাড়ীতে যে অগ্নিকান্ড ঘটল, পূর্ণিয়াতে বসে একবার শয্যা ছেড়ে না উঠে ঠাকুর মহাশয় কি করে তাদের রক্ষা করলেন? এটা কী সম্ভব?
ঠাকুর মহাশয়ের কথা সত্য বলে মানা উচিত,
কিন্তু যা আদৌ সম্ভবপর নয়, সেখানে বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না।
ঘটনার কয়েকদিন পরে তারা তিনজন প্রতিদিনের মত সন্ধ্যায় সমবেত হয়েছেন অতুলবাবুর বাসগৃহে কীর্তন-আনন্দ লাভের জন্য। কীর্তন আরম্ভ করার পূর্বে পূর্ণিয়া থেকে আসা পত্রখানি অতুলবাবু তুলে দিলেন প্রভাতচন্দ্র ও বীরেন রায়ের হাতে। এক অপরিচিত,
ঠাকুর মহাশয়ের আশ্রিতের লেখা পত্রখানি।
অতুলবাবুর নাম ও ঠিকানা তিনি ঠাকুর মহাশয়ের কাছ থেকেই সংগ্রহ করেছেন।
দিন ও ক্ষণ উল্লেখ করে তিনি জানতে চেয়েছেন অতুলবাবুর গৃহে অনুষ্ঠিত কীর্তনের সময় সেদিনের অগ্নিকান্ডের কথা। আর একথাও তিনি জানিয়েছেন যে ঐদিন ঘটনার আগে বা পরে ঠাকুর মহাশয় তার গৃহেই ছিলেন,
ক্ষণকালের জন্যও বাড়ীর বাহিরে যাননি।
কলিকাতায় যে সময় ঘটনা ঘটে সে সময়ে তার পরিবারের সকলেই এবং পূর্ণিয়ার আরও দু'পাঁচজন ঠাকুর মহাশয়ের সামনে উপস্থিত ছিলেন।
অথচ ঠাকুর মহাশয় নিজ মুখে প্রকাশ করেছেন যে তাদের কাহাকেও রক্ষা করতে গিয়ে তাঁহার দুই হাত দগ্ধ হয়েছে। এক স্থান ত্যাগ না করে কেহ তো অন্যত্র উপস্থিত হতে পারেন না। ইহা চিরন্তন সত্য।
তাদের এই সন্দেহ নিরসনের জন্যই অতুলবাবুকে তার এই পত্র লেখা।
সত্বর জবাব পেলে সত্যাসত্য নিরূপণের সহায়ক হবে।
পূর্ণিয়া থেকে আসা পত্রটি পড়ে তিনজনই স্তম্ভিত হয়ে রইলেন অনেকক্ষণ।
অগ্নি অগ্রাহ্য করেননি বীরেন রায়কে।
ঠাকুর মহাশয়ের সাহায্যেই বীরেনবাবু রক্ষা পেয়েছেন। তা'হলে তাদের বেসুরো কীর্তনের সময় স্বয়ং ঠাকুর মহাশয় উপস্থিত ছিলেন। আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন তারা তিনজন।
অতুলবাবু চিঠির উত্তর দিলেন অতি সংক্ষেপে। পত্র লেখককে জানালেন অগ্নিকান্ডের কথা; অসম্ভব উপায়ে বীরেনবাবু যে রক্ষা পেয়েছিলেন তাহা সম্পূর্ণরূপে ঠাকুর মহাশয়ের করুণায়।
কী করে ঠাকুর মহাশয়ের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব হলো, একমাত্র ঠাকুর মহাশয় তা বলতে পারেন।
অতুলবাবুর পক্ষে সেটা বলা অসম্ভব।
তবে একই সময়ে ঠাকুর মহাশয়ের একাধিক স্থানে উপস্থিতির কথা তারা শুনেছেন। দু'একবার এ ব্যাপারে তারা প্রত্যক্ষও করেছেন। এখন ঠাকুর মহাশয়ের কথায় বিশ্বাস রাখা না রাখা সম্পূর্ণভাবে পত্র-লেখকের উপরই নির্ভর করে, সেক্ষেত্রে তাদের বলার কিছুই নেই।
ঠাকুর মহাশয়ের কথা অসম্ভব বলে মনে হলেও সর্বদা সত্য। সেখানে তিলমাত্র মিথ্যার স্থান নেই।
জয় রাম জয় রাম জয় রাম





.jpg)
No comments: