আমি অন্ধ এবং (কর্তা) হইয়া যাহা বোধ করি তাহা সকলই ক্ষয়শীল, অস্থায়ী, কাজেই ক্ষয়েরই কর্ত্তা। যদি আমি ক্ষয়েরই কর্ত্তা হইলাম, আমি ক্ষয়ের কর্ত্তা বলিয়া নিশ্চয় জানিলাম, তবে আমার স্ত্রী কি পরিবার ক্ষয়যুক্ত স্থিতিহীন। কিন্তু সকলের দেহী অক্ষয়, নিত্য, অসীম পূর্ণরুপে বিরাজ করে, তার ক্ষয়ও নাই, গতাগতিও নাই জানিবেন। বিশেষত: আমি যখন ঘুমাই তখন আমার কেউ থাকে? তাহারা যায় কোথায়? জানিতে পারেন? তবে কেন দেহীকে ছাড়িয়া দেহ, অনিত্য অস্থায়ী বস্তুর চিন্তা করেন? শৈশব হইতেই দেহ রুপান্তর হইতেছে। দেহী একরকমই থাকেন-ক্ষয় নাই। ……… দেহীর পরিবর্ত্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধি নাই। দেহই কাল্পনিক[?] পরিবর্ত্তনশীল, দেহ অস্থায়ী;তাহার ত্যাগ না হওয়া পর্য্যন্ত সত্যরুপকে বন্ধন হইতে কি করিয়া মুক্ত করা হয় (?) দিন রাত্রি ত রোজই হইতেছে। বিরাম নাই। সেইরুপ দেহেরও বিশ্রাম নাই ঘড়ির কাটার মত সর্ব্ব সময় কাল চক্রাকারে ঘুরিতেছে-বিশ্রাম নাই। দেহীর কোন বন্ধন নাই। বড় ছোট সকলের মধ্যেই আলক পূর্ণ বিরাজ করে। তাঁহার সঙ্গ হইলে দেহত্যাগ হয়-নচেৎ নয় জানিবেন।
পাঠ্যের দার্শনিক ব্যাখ্যা
প্রদত্ত বাংলা পাঠ্যটি গভীর দার্শনিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করে, প্রাথমিকভাবে নশ্বর শারীরিক দেহ (দেহ) এবং আত্মার (দেহী) শাশ্বত সত্তার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে। বক্তা, তার জাগতিক উপলব্ধিতে নিজেকে 'অন্ধ' হিসাবে চিহ্নিত করে, অস্তিত্বের অনিত্যতা এবং মুক্তির পথের উপর আলোকপাত করেছেন। পাঠ্যে উপস্থাপিত মূল ধারণাগুলির একটি পয়েন্ট-ভিত্তিক ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
1.'আমি' (কর্তা) এর নশ্বরতা সম্পর্কে ধারণা: বক্তা, 'অন্ধত্ব' বা অজ্ঞতার অবস্থা থেকে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সবকিছুকে ক্ষণস্থায়ী এবং ক্ষয়শীল হিসাবে উপলব্ধি করেন। এর ফলে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে 'আমি' (কর্তা), অর্থাৎ উপলব্ধি এবং কর্মের কর্তা, সহজাতভাবে ক্ষয় এবং অনিত্যতার কর্তা।
2.জাগতিক সম্পর্কের উপর ক্ষয়ের প্রভাব: এই উপলব্ধিকে প্রসারিত করে, বক্তা উল্লেখ করেন যে যদি 'আমি' ক্ষয়ের কর্তা হয়, তবে স্ত্রী এবং পরিবারের মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলিও ক্ষয়শীল এবং সহজাতভাবে অস্থির বা অনিত্য (ক্ষয়যুক্ত স্থিতিহীন)।
3.'দেহী' (আত্মা/অন্তর্যামী) এর শাশ্বত প্রকৃতি: নশ্বর দেহ এবং ক্ষণস্থায়ী 'আমি' এর বিপরীতে, পাঠ্যটি 'দেহী' ধারণার প্রবর্তন করে। এই 'দেহী' কে নিম্নলিখিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
•অক্ষয়: এটি ক্ষয় হয় না।
•নিত্য: এটি চিরন্তন।
•অসীম ও পূর্ণ: এটি অসীম এবং নিখুঁত রূপে বিরাজ করে।
•ক্ষয় বা গতিহীন: এটি বিনাশ, জন্ম এবং মৃত্যুর ঊর্ধ্বে।
4.ঘুমের সময় জাগতিক আসক্তির বিভ্রম: পাঠ্যটি ঘুমের সময়কার অবস্থা সম্পর্কে একটি অলঙ্কারিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: "আমি যখন ঘুমাই তখন আমার কেউ থাকে? তাহারা যায় কোথায়? জানিতে পারেন?" এটি জাগতিক সম্পর্ক এবং সম্পত্তির অস্থায়ী প্রকৃতিকে তুলে ধরে, যা গভীর ঘুমে থাকা ব্যক্তির জন্য অপ্রাসঙ্গিক বা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে, এর মাধ্যমে এই ক্ষণস্থায়ী আসক্তিগুলির বাইরে একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে।
5.অস্থায়ী দেহ (দেহ) এর উপর ভুল মনোযোগ: বক্তা মানুষের শারীরিক দেহ (দেহ) এর উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যা স্পষ্টভাবে অনিত্য এবং অস্থায়ী হিসাবে বর্ণিত হয়েছে, শাশ্বত 'দেহী' নিয়ে চিন্তা করার পরিবর্তে।
6.দেহের রূপান্তর বনাম দেহীর স্থিরতা: শৈশবকাল থেকেই শারীরিক দেহ ক্রমাগত রূপান্তরিত হয় (শৈশব হইতেই দেহ রুপান্তর হইতেছে)। তবে, 'দেহী' স্থির এবং অপরিবর্তিত থাকে, কোনো ক্ষয় ছাড়াই (দেহী একরকমই থাকেন-ক্ষয় নাই)।
7.'দেহী' এর অপরিবর্তনীয়তা: 'দেহী' কে আরও জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে এটি পরিবর্তন, হ্রাস বা বৃদ্ধিহীন (দেহীর পরিবর্ত্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধি নাই), যা এর শাশ্বত এবং নিখুঁত প্রকৃতিকে শক্তিশালী করে।
8.দেহকে কাল্পনিক ও পরিবর্তনশীল হিসাবে দেখা: দেহকে 'কাল্পনিক' বা 'বিভ্রমমূলক' (কাল্পনিক[?]) এবং সহজাতভাবে পরিবর্তনশীল (পরিবর্ত্তনশীল) হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি অস্থায়ী (অস্থায়ী), যার অর্থ এর অস্তিত্ব চূড়ান্ত বাস্তবতা নয়।
9.শারীরিক বন্ধন থেকে মুক্তির অন্বেষণ: একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে: "দেহ ত্যাগ না হওয়া পর্য্যন্ত সত্যরুপকে বন্ধন হইতে কি করিয়া মুক্ত করা হয় (?) " এটি নিজের সত্য, শাশ্বত প্রকৃতি উপলব্ধি করার জন্য শারীরিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
10.সময় এবং দেহের অবিরাম চক্র: দিন ও রাত যেমন অবিরাম বিশ্রামহীনভাবে ঘটে (দিন রাত্রি ত রোজই হইতেছে। বিরাম নাই), তেমনি দেহেরও কোনো প্রকৃত বিশ্রাম নেই। এটি ঘড়ির কাঁটার অবিরাম গতির মতো সময়ের চক্রের মধ্যে ক্রমাগত ঘুরছে (ঘড়ির কাটার মত সর্ব্ব সময় কাল চক্রাকারে ঘুরিতেছে-বিশ্রাম নাই)।
11.'দেহী' এর স্বাধীনতা এবং সর্বব্যাপীতা: 'দেহী' সহজাতভাবে সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত (দেহীর কোন বন্ধন নাই)। এটিকে আলোতে পূর্ণ (আলক পূর্ণ বিরাজ করে) এবং সকলের মধ্যে উপস্থিত হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাদের শারীরিক আকার বা জাগতিক অবস্থা নির্বিশেষে (বড় ছোট সকলের মধ্যেই)।
12.'দেহী' এর সাথে সঙ্গের মাধ্যমে মুক্তি: পাঠ্যটি এই বলে শেষ হয় যে প্রকৃত মুক্তি, বা দেহ ত্যাগ (দেহত্যাগ), কেবল 'দেহী' এর সাথে সঙ্গ বা উপলব্ধির মাধ্যমেই ঘটে (তাঁহার সঙ্গ হইলে দেহত্যাগ হয়-নচেৎ নয় জানিবেন)। এই উপলব্ধি ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়।
সংক্ষেপে, পাঠ্যটি পাঠককে নশ্বর এবং বিভ্রমমূলক শারীরিক অস্তিত্বের সাথে পরিচিতি থেকে শাশ্বত, অপরিবর্তনীয় এবং মুক্ত 'দেহী' বা আত্মার প্রকৃতি বোঝা এবং উপলব্ধি করার দিকে পরিচালিত করে।
বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড,শ্রীশ্রীরামঠাকুর,বেদবানী পত্রাংশ নং
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
February 23, 2026
Rating: 5
No comments: