ভগবান শিবের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ: কোথায় অবস্থিত এবং কী তাদের বিশেষত্ব?
ওঁ নমঃ শিবায়। হর হর মহাদেব।
হিন্দুধর্মে ভগবান শিবের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ অত্যন্ত পবিত্র ও মাহাত্ম্যপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। শিবপুরাণ অনুসারে, ভগবান শিব একবার অসীম জ্যোতির্ময় স্তম্ভ বা আলোকস্তম্ভরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই দিব্য জ্যোতির প্রতীক হিসেবেই জ্যোতির্লিঙ্গের পূজা করা হয়।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ শিবের অসীম শক্তি, মহিমা, করুণা ও দিব্যসত্তার প্রতীক। প্রতিটি জ্যোতির্লিঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশেষ পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
এই প্রতিবেদনে জেনে নিন ভগবান শিবের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের নাম, অবস্থান, পৌরাণিক মাহাত্ম্য এবং বিশেষত্ব।
সূচিপত্র: ভগবান শিবের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ
- সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ — গুজরাট
- মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ — অন্ধ্রপ্রদেশ
- মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ — মধ্যপ্রদেশ
- ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ — মধ্যপ্রদেশ
- বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ — ঝাড়খণ্ড
- ভীমশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ — মহারাষ্ট্র
- রামেশ্বরম জ্যোতির্লিঙ্গ — তামিলনাড়ু
- নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ — গুজরাট
- কাশী বিশ্বনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ — উত্তরপ্রদেশ
- ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ — মহারাষ্ট্র
- কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ — উত্তরাখণ্ড
- ঘৃষ্ণেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ — মহারাষ্ট্র
১. সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ (গুজরাট)
অবস্থান
সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ গুজরাটের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের প্রভাস পাটনে, আরব সাগরের তীরে অবস্থিত। এটি দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম হিসেবে পরিচিত।
পৌরাণিক কাহিনি
পুরাণের কাহিনি অনুসারে, চন্দ্রদেব দক্ষ প্রজাপতির অভিশাপে নিজের জ্যোতি হারিয়েছিলেন। অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি ভগবান শিবের তপস্যা করেন। শিব তাঁর প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করেন। সেই কাহিনির সঙ্গে সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের উৎপত্তি জড়িত।
সোমনাথ মন্দিরের বিশেষত্ব
- ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত শিবতীর্থ।
- আরব সাগরের তীরে অবস্থিত মনোরম মন্দির।
- ইতিহাসে বহুবার মন্দিরটি ধ্বংস ও পুনর্নির্মিত হয়েছে।
- সোমনাথ নামের অর্থ চন্দ্রের অধিপতি।
২. মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ (অন্ধ্রপ্রদেশ)
অবস্থান
মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলমে কৃষ্ণা নদীর তীরে নল্লামালা পাহাড়ে অবস্থিত।
পৌরাণিক মাহাত্ম্য
মল্লিকার্জুন মন্দির ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর সম্মিলিত পবিত্র আবাস হিসেবে পূজিত। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, কার্তিকেয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত পারিবারিক ঘটনার পর শিব ও পার্বতী শ্রীশৈলমে অবস্থান করেন।
মন্দিরের বিশেষত্ব
- এটি একই সঙ্গে জ্যোতির্লিঙ্গ ও শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত।
- মহাশিবরাত্রি এখানে অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়।
- নল্লামালা পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্দিরের আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
- শৈব ও শাক্ত উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই এটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।
৩. মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ (মধ্যপ্রদেশ)
অবস্থান
মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরে শিপ্রা নদীর তীরে অবস্থিত।
পৌরাণিক কাহিনি
পুরাণ অনুসারে, উজ্জয়িনীর ভক্তদের রক্ষা করার জন্য ভগবান শিব মহাকাল রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি দুষ্ট শক্তিকে বিনাশ করে ভক্তদের রক্ষা করেন।
মহাকালেশ্বর মন্দিরের বিশেষত্ব
- মহাকাল অর্থাৎ সময়ের অধিপতি হিসেবে শিব এখানে পূজিত হন।
- এটি ভারতের অন্যতম বিখ্যাত শিবমন্দির।
- এখানে প্রতিদিন ভোরে বিখ্যাত ভস্ম আরতি অনুষ্ঠিত হয়।
- মহাকালেশ্বরের শিবলিঙ্গ দক্ষিণমুখী, যা এই মন্দিরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
৪. ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ (মধ্যপ্রদেশ)
অবস্থান
ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মধ্যপ্রদেশের খণ্ডওয়া জেলায় নর্মদা নদীর ওপর মান্ধাতা দ্বীপে অবস্থিত।
পৌরাণিক মাহাত্ম্য
ওঙ্কারেশ্বর নামটি পবিত্র 'ওঁ' ধ্বনির সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই দ্বীপের আকৃতি ওঁ-কারের মতো। এখানে ভগবান শিব ওঙ্কারেশ্বর রূপে পূজিত হন।
মন্দিরের বিশেষত্ব
- নর্মদা নদীর বুকে অবস্থিত একটি পবিত্র দ্বীপে মন্দিরটি নির্মিত।
- দ্বীপটির আকৃতি ওঁ-কারের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
- নর্মদা পরিক্রমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।
- এখানে শিবের ওঙ্কারেশ্বর ও মামলেশ্বর মন্দির দর্শন করেন ভক্তরা।
৫. বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ (ঝাড়খণ্ড)
অবস্থান
বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে অবস্থিত। এটি বাবা বৈদ্যনাথ ধাম নামেও পরিচিত।
পৌরাণিক কাহিনি
প্রচলিত পুরাণকাহিনি অনুসারে, রাবণ ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে শিব তাঁকে একটি শিবলিঙ্গ প্রদান করেন। সেই শিবলিঙ্গের সঙ্গে বৈদ্যনাথ ধামের উৎপত্তির কাহিনি জড়িত।
বৈদ্যনাথ ধামের বিশেষত্ব
- এখানে ভগবান শিব বৈদ্যনাথ বা চিকিৎসক রূপে পূজিত হন।
- ভক্তদের বিশ্বাস, শিবের আরাধনায় রোগ-শোক থেকে মুক্তি ও আরোগ্য লাভের আশীর্বাদ পাওয়া যায়।
- শ্রাবণ মাসে লক্ষ লক্ষ ভক্ত বাবাধামের দর্শনে আসেন।
- শ্রাবণী মেলা এই মন্দিরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
৬. ভীমশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ (মহারাষ্ট্র)
অবস্থান
ভীমশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ মহারাষ্ট্রের পুনে জেলার সাহ্যাদ্রি পর্বতমালায় অবস্থিত। এটি ঘন অরণ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা।
পৌরাণিক কাহিনি
পুরাণ অনুসারে, ভীম নামে এক অসুরের অত্যাচারে দেবতা ও ভক্তরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। ভক্তদের রক্ষার জন্য ভগবান শিব ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং তাকে বধ করেন। সেই স্থানেই ভীমশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গের আবির্ভাব ঘটে বলে বিশ্বাস করা হয়।
মন্দিরের বিশেষত্ব
- সাহ্যাদ্রি পর্বতমালার প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত।
- ভীমা নদীর উৎপত্তিস্থল হিসেবে এই অঞ্চল পরিচিত।
- মন্দিরের স্থাপত্যে প্রাচীন নাগর শৈলীর প্রভাব রয়েছে।
- এটি ধর্মীয় তীর্থের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও আকর্ষণীয়।
৭. রামেশ্বরম জ্যোতির্লিঙ্গ (তামিলনাড়ু)
অবস্থান
রামেশ্বরম জ্যোতির্লিঙ্গ তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম দ্বীপে অবস্থিত। এটি বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন অঞ্চলের একটি পবিত্র তীর্থস্থান।
রামেশ্বরমের পৌরাণিক কাহিনি
রামায়ণের প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, লঙ্কা অভিযানের আগে ভগবান শ্রীরাম এখানে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে ভগবান শিবের পূজা করেছিলেন। সেই কারণে এই স্থান রামেশ্বরম নামে পরিচিত।
রামেশ্বরম মন্দিরের বিশেষত্ব
- চারধামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।
- দীর্ঘ ও সুসজ্জিত স্তম্ভযুক্ত করিডরের জন্য বিখ্যাত।
- মন্দিরের ২২টি পবিত্র কূপের জল দিয়ে স্নানের বিশেষ ধর্মীয় প্রথা রয়েছে।
- শৈব ও বৈষ্ণব উভয় ভক্তদের কাছে এই মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
৮. নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ (গুজরাট)
অবস্থান
নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ গুজরাটের দ্বারকার কাছে অবস্থিত। এটি নাগেশ্বর মহাদেব মন্দির নামেও পরিচিত।
পৌরাণিক কাহিনি
শিবপুরাণের কাহিনি অনুসারে, দারুক নামে এক অসুর ও তার বাহিনী ভক্তদের বন্দি করে অত্যাচার করত। শিবভক্ত সুপ্রিয়ের প্রার্থনায় ভগবান শিব আবির্ভূত হয়ে ভক্তদের রক্ষা করেন। সেই কাহিনির সঙ্গে নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের উৎপত্তি জড়িত।
নাগেশ্বর মন্দিরের বিশেষত্ব
- এখানে ভগবান শিব নাগেশ্বর বা নাগের অধিপতি রূপে পূজিত হন।
- মন্দিরটি দ্বারকার নিকটবর্তী হওয়ায় কৃষ্ণভক্তদের কাছেও আকর্ষণীয়।
- মন্দির প্রাঙ্গণে শিবের বিশাল মূর্তি রয়েছে।
- শিবের সুরক্ষা ও অভয়দানের প্রতীক হিসেবে এই তীর্থের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
৯. কাশী বিশ্বনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ (উত্তরপ্রদেশ)
অবস্থান
কাশী বিশ্বনাথ মন্দির উত্তরপ্রদেশের বারাণসী বা কাশী শহরে গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র শিবতীর্থ।
পৌরাণিক মাহাত্ম্য
হিন্দুধর্মে কাশীকে মোক্ষলাভের পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, মৃত্যুর সময় ভগবান শিব কাশীতে তাঁর ভক্তদের তারকব্রহ্ম মন্ত্র প্রদান করেন এবং তাঁদের মুক্তির পথ দেখান।
কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের বিশেষত্ব
- কাশীকে শিবের প্রিয় নগরী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
- এখানে ভগবান শিব বিশ্বনাথ বা সমগ্র বিশ্বের অধিপতি রূপে পূজিত হন।
- গঙ্গার ঘাট ও মন্দিরের আধ্যাত্মিক পরিবেশ ভক্তদের আকর্ষণ করে।
- কাশী বিশ্বনাথ করিডর মন্দির দর্শনকে আরও সহজ করেছে।
১০. ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ (মহারাষ্ট্র)
অবস্থান
ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার ত্র্যম্বক শহরে অবস্থিত। এখানেই গোদাবরী নদীর উৎপত্তিস্থল বলে পরিচিত।
পৌরাণিক কাহিনি
পুরাণ অনুসারে, ঋষি গৌতমের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শিব গোদাবরী নদীকে পৃথিবীতে প্রবাহিত হওয়ার আশীর্বাদ দেন। সেই কাহিনির সঙ্গে ত্র্যম্বকেশ্বরের মাহাত্ম্য জড়িত।
ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দিরের বিশেষত্ব
- এখানে শিবের ত্র্যম্বক বা তিন নেত্রবিশিষ্ট রূপের আরাধনা করা হয়।
- শিবলিঙ্গের মধ্যে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের প্রতীকী উপস্থিতি রয়েছে বলে প্রচলিত বিশ্বাস।
- গোদাবরী নদীর উৎসস্থলের নিকটবর্তী হওয়ায় এটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থ।
- নারায়ণ নাগবলি-সহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালনের জন্য এই স্থান বিখ্যাত।
১১. কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ (উত্তরাখণ্ড)
অবস্থান
কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় হিমালয়ের কোলে অবস্থিত। সমুদ্রপৃ
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
Rating:







.jpg)
কোন মন্তব্য নেই: