নামস্মরণ, মন ও ধ্যানের রহস্য | শ্রীশ্রী রামঠাকুরের অমৃতবাণী
“মনের দিকে লক্ষ্য রাখবা না। লক্ষ্য রাখবা নামের দিকে।”
🌸 নাম করতে বসলে মন কেন চঞ্চল হয়?
নামস্মরণ করতে বসলে অনেক সময় মন বিভিন্ন স্থান ও বিভিন্ন বিষয়ে ঘুরে বেড়ায়। মনকে একাগ্র করতে না পেরে সাধকের মনে প্রশ্ন জাগে—নাম কি সত্যিই হচ্ছে? এই গভীর প্রশ্নের উত্তরেই শ্রীশ্রী রামঠাকুর নামসাধনা, মন এবং ধ্যান সম্পর্কে অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর একটি পথনির্দেশ দিয়েছেন।
🕉️ শ্রীশ্রী রামঠাকুরের বাণী
“তোমার পূর্বজন্মের সাধিত নাম শুনাইছি, নাম দেই নাই। মাতৃজঠরেও নাম শুনাইছিলাম। প্রকৃতির রাজ্যে আইসা নাম ভুইলা গেছ। পুনরায় নাম স্মরণ করাইয়া দিছি।”
🌺 নাম দেওয়া নয়, নাম স্মরণ করিয়ে দেওয়া
ঠাকুরের এই কথার মধ্যে নামসাধনার একটি গভীর তত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। নামকে এখানে নতুন কোনো বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলা হয়নি। বরং মানুষের অন্তরে পূর্ব থেকেই যে চিরন্তন নামের সম্পর্ক রয়েছে, সেই বিস্মৃত নামকে পুনরায় স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে।
প্রকৃতির জগতে এসে মানুষ সেই অন্তর্নিহিত স্মৃতি ভুলে যায়। তাই নামসাধনার উদ্দেশ্য হলো সেই নামকে পুনরায় স্মরণ করা এবং ক্রমে নামের সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ককে দৃঢ় করা।
🧘 মন যেদিকে খুশি যাক—লক্ষ্য থাকবে নামের দিকে
“মন যেইখানে ইচ্ছা ঘুইরা বেড়াউক। তুমি নাম শুনার চেষ্টা করবা। মনের দিকে লক্ষ্য রাখবা না। লক্ষ্য রাখবা নামের দিকে।”
সাধনার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ। মনকে জোর করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখার চেষ্টা না করে নামের দিকে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস করতে বলা হয়েছে।
মানুষের মন স্বভাবতই চঞ্চল। কখনও অতীতের কথা মনে পড়ে, কখনও ভবিষ্যতের চিন্তা আসে, আবার কখনও নানা বিষয় ও ইচ্ছা মনকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই চঞ্চলতার সঙ্গে যুদ্ধ না করে নাম শোনার অভ্যাস চালিয়ে যেতে হবে।
🌿 নিয়মিত অভ্যাসেই মনের স্থিরতা
ঠাকুর বলেছেন—
“মনের গতি চিরচঞ্চল। যত চঞ্চল হউক, আর যেইখানে যাউক না কেন ফিরা আবার নিজের জায়গায় আসব। ফিরা আইসা তুমি যেই নাম শুনছ, মনও সেই নাম শুনতে পাইব।”
অর্থাৎ, মনকে জোর করে থামানোর প্রয়োজন নেই। নিয়মিত নামশ্রবণের অভ্যাস তৈরি করতে থাকলে মন ধীরে ধীরে নিজের চঞ্চলতা ত্যাগ করে নামের দিকে ফিরে আসতে শুরু করবে।
তাই সাধনার ক্ষেত্রে প্রধান বিষয় হলো অভ্যাস। একদিনেই মন স্থির হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা না করে ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিদিন নামস্মরণ করা প্রয়োজন।
🪔 নামস্মরণ থেকে ধ্যানের উদয়
ঠাকুরের বাণী অনুযায়ী, নিয়মিত নামশ্রবণ ও নামস্মরণের মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে বিষয়ান্তর থেকে ফিরে এসে নামের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। এই অবস্থায় মনের চঞ্চলতা কমে এবং স্থির ভাবের উদয় হয়।
“তখন মন প্রাণের সঙ্গে যুক্ত হইয়া মঞ্জুরী হইয়া যাইব। ধ্যানের উদয় হইব।”
❓ ধ্যান বলে কাকে?
প্রশ্ন:
“ধ্যান বলে কাকে?”
ঠাকুর:
“তৎ-ময় হওয়ারে ধ্যান বলে।”
🌼 তন্ময়তা কী?
প্রশ্ন:
“তৎ-ময় কি কিছুই বুঝতে পারলাম না।”
ঠাকুর:
“তৎ হইল প্রাণ, আর ময় হইল মিশা, একাকার হইয়া যাওয়া। মন ও মনের বিষয়গুলি এবং বুদ্ধি, অহঙ্কার প্রাণের সঙ্গে মিশা যাওয়ার নাম তন্ময়তা।”
এখানে তন্ময়তা বলতে প্রাণের সঙ্গে মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কারের একাত্ম হয়ে যাওয়ার অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। এই অবস্থাকে শুধু শুনে বা পড়ে বোঝা যায় না; সাধনার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে হয়।
“শুধু শুইনা বুঝবার চেষ্টা করলে বুঝা যায় না, কার্য কইরা বুঝলেই বুঝা হয়। ধ্যান করলে তবে বুঝতে পারবা।”
🔥 অভ্যাসের দ্বারা অসম্ভব সম্ভব
সাধনার পথে নিয়মিত অভ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথম অবস্থায় যে বিষয় কঠিন বলে মনে হয়, দীর্ঘদিনের অভ্যাসের মাধ্যমে সেটিই সহজ হয়ে উঠতে পারে।
“অভ্যাসের দ্বারা অসম্ভব সম্ভব হয়। এই পুরুষকার লক্ষ্মীরূপা।”
👁️ মনের বিষয়গুলি কী?
প্রশ্ন:
“মনের বিষয়গুলি কি?”
ঠাকুর:
“দশ ইন্দ্রিয়।”
অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এই ইন্দ্রিয়গত আকর্ষণ ও বিচরণের কারণেই মন বিভিন্ন দিকে ছুটে বেড়ায়। নামস্মরণের অভ্যাসে সেই মনকে ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী করার পথ দেখানো হয়েছে।
🕉️ কিসের ধ্যান করব?
প্রশ্ন:
“কিসের ধ্যান করব?”
ঠাকুর:
“নামের ধ্যান করবা।”
“ধ্যানের সময় কিছু কল্পনা করতে নাই। নাম অকল্প।”
🌸 বাণীর সারকথা
এই কথোপকথনের মূল শিক্ষা হলো—নামসাধনার সময় মনের চঞ্চলতাকে দেখে হতাশ হওয়া উচিত নয়। মন তার স্বভাব অনুযায়ী বিভিন্ন দিকে যাবে। সাধকের কর্তব্য হলো মনের গতির দিকে অতিরিক্ত লক্ষ্য না রেখে নাম শোনার চেষ্টা করা।
নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে নামের দিকে ফিরে আসবে। নামস্মরণ গভীর হলে মনের স্থিরতা বৃদ্ধি পাবে এবং ধ্যানের উদয় হবে। ধ্যান কোনো কল্পিত বিষয় নয়; নামের মধ্যে তন্ময় হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই ধ্যানের পথে নিয়ে যায়।
🌺 আজকের শিক্ষার কয়েকটি মূল কথা
১. মন চঞ্চল হওয়া স্বাভাবিক।
২. মনের দিকে অতিরিক্ত লক্ষ্য না রেখে নামের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
৩. নাম শোনার অভ্যাস নিয়মিত করতে হবে।
৪. অভ্যাসের মাধ্যমে মন ধীরে ধীরে স্থির হয়।
৫. ধ্যানের জন্য কল্পনা নয়, নামের আশ্রয় গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
৬. সাধনার প্রকৃত উপলব্ধি অভ্যাস ও কার্যকর অনুশীলনের মাধ্যমে আসে।
🙏 নাম স্মরণে মন শান্ত হোক
“মনের দিকে লক্ষ্য রাখবা না। লক্ষ্য রাখবা নামের দিকে।”
জয়রাম • জয়গোবিন্দ
রামভাই স্মরণে
শ্রী ফণীন্দ্র কুমার মালাকার
🔎 সম্পর্কিত বিষয়
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের বাণী, নামস্মরণ, নামের ধ্যান, ধ্যান কী, তন্ময়তা, রামঠাকুরের উপদেশ, রামঠাকুরের বাণী, নাম সাধনা, মন চঞ্চল হলে কী করবেন, আধ্যাত্মিক সাধনা, গুরু ও নাম, রামভাই স্মরণে, শ্রী ফণীন্দ্র কুমার মালাকার
#️⃣ Hashtags
#শ্রীশ্রীরামঠাকুর #রামঠাকুর #রামঠাকুরেরবাণী #নামস্মরণ #নামসাধনা #ধ্যান #তন্ময়তা #গুরুবাণী #আধ্যাত্মিকতা #সৎসঙ্গ #জয়রাম #জয়গোবিন্দ #রামভাইস্মরণে
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
অক্টোবর ০৮, ২০২৬
Rating:
.png)





.jpg)
কোন মন্তব্য নেই: