🌺 বেদবাণী – তৃতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের বাণী | (১৫২)
“আমার স্ত্রী, আমার পুত্র, আমার ধন, আমার শরীর—সবই কি সত্যিই আমার?”
আমরা সারাজীবন ‘আমার’ শব্দটিকে আঁকড়ে ধরে থাকি।
কিন্তু শ্রীশ্রী রামঠাকুর আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন—সংসারকে ত্যাগ নয়, বরং ভগবানের দিকে লক্ষ্য রেখে সংসারের কর্তব্য পালন করাই সাধনার পথ।
আজকের বেদবাণীর এই গভীর কথাটি আমাদের ‘আমার’ ভাবনা থেকে ‘তাঁর’ ভাবনার দিকে নিয়ে যায়।
জয় গুরু। প্রণাম শ্রীশ্রী রামঠাকুরের চরণে।
আজ আমরা আলোচনা করব বেদবাণী তৃতীয় খণ্ডের ১৫২ নম্বর বাণী।
“কেবল দিবানিশি ভগবানের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া সংসারের উপস্থিত মতে কার্য করিয়া যাইতে চেষ্টা করুন।”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই রয়েছে সুন্দর সংসারজীবন এবং আধ্যাত্মিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
১️⃣ ভগবানের দিকে লক্ষ্য রেখে সংসারধর্ম পালন
শ্রীশ্রী রামঠাকুর বলছেন—
সংসার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা নয়।
আমাদের পরিবার আছে, কর্ম আছে, দায়িত্ব আছে, সমাজের প্রতি কর্তব্য আছে। সেই সমস্ত কাজ করতে হবে, কিন্তু মনের লক্ষ্য যেন ভগবানের দিকে থাকে।
অর্থাৎ—
হাত থাকবে সংসারের কাজে, কিন্তু মন থাকবে ভগবানের স্মরণে।
গীতাতেও কর্মের মধ্য দিয়েই আধ্যাত্মিক জীবনের পথ দেখানো হয়েছে।
“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।”
অর্থাৎ আমাদের অধিকার কর্মে, কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি আসক্তিই যেন আমাদের বন্ধন না হয়ে দাঁড়ায়।
২️⃣ পরিবারকে ঘৃণা করা নয়
বাণীতে বলা হয়েছে—
“পরিবারকে ঘৃণা করিতে নাই।”
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
অনেক সময় মানুষ মনে করে আধ্যাত্মিক জীবন মানেই সংসার থেকে দূরে সরে যাওয়া।
কিন্তু এখানে বলা হচ্ছে—পরিবারকে ঘৃণা করতে নেই।
পরিবারের মানুষকে ভালোবাসুন, তাদের প্রতি কর্তব্য পালন করুন, কিন্তু তাদেরকে নিজের অহংকারের সম্পত্তি মনে করবেন না।
পরিবারকে দেখুন ভগবানের দেওয়া দায়িত্ব হিসেবে।
৩️⃣ “সকলই গুরুর শক্তি”
বাণীতে এসেছে—
“সকলই গুরুর শক্তি। গুরুর ইচ্ছায়ই সকল সংযোগ হইতেছে।”
আমরা জীবনে যাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করি, তাদের প্রত্যেক সম্পর্কের মধ্যেই একটি শিক্ষা রয়েছে।
পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়, বন্ধু—
সব সম্পর্ককে যদি আমরা কেবল “আমার” বলে দেখি, তাহলে আসক্তি জন্মায়।
কিন্তু যদি ভাবি—
“সবই গুরুর শক্তির প্রকাশ”,
তাহলে সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু অহংকার কমবে।
৪️⃣ “আমার” ভাবনাই বন্ধনের কারণ
বাণীর সবচেয়ে গভীর অংশটি হলো—
“আমার স্ত্রী, আমার পুত্র, আমার ধন, আমার শরীর জ্ঞান করিয়া জীব কর্মপাশে বদ্ধ হয়।”
খেয়াল করুন—এখানে বারবার আসছে “আমার”।
আমার বাড়ি।
আমার টাকা।
আমার সন্তান।
আমার সম্মান।
আমার শরীর।
আমার পরিচয়।
এই “আমার” ভাবনাই ধীরে ধীরে মানুষকে কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে।
সংসারে থাকা সমস্যা নয়।
সংসারের প্রতি অতিরিক্ত ‘আমিত্ব’ই বন্ধনের কারণ।
৫️⃣ গীতার শিক্ষা — আসক্তিহীন কর্ম
ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—
“তস্মাদসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচর।”
অর্থাৎ আসক্তি ত্যাগ করে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করতে হবে।
এখানে “আসক্তিহীন” মানে ভালোবাসাহীন নয়।
বরং—
ভালোবাসা থাকবে, কর্তব্য থাকবে, কিন্তু অধিকারবোধ ও অহংকার থাকবে না।
এই পার্থক্যটি বুঝতে পারলে সংসারজীবনও সাধনার পথ হয়ে উঠতে পারে।
৬️⃣ আমার জ্ঞান বনাম ভগবৎ জ্ঞান
বাণীতে বলা হয়েছে—
“আমার জ্ঞানই মিথ্যা, ভগবৎ জ্ঞানই সত্য…”
এখানে “আমার জ্ঞান” বলতে নিজের সীমিত অহংকার ও নিজস্ব ধারণাকে বোঝানো হয়েছে।
আমরা মনে করি—
আমি করছি।
আমি অর্জন করছি।
আমি রক্ষা করছি।
আমি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।
কিন্তু সত্যিই কি সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে?
জীবনের কত ঘটনা আমাদের ইচ্ছার বাইরে ঘটে যায়!
তাই গীতার শিক্ষাও আমাদের অহংকার ত্যাগ করে ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণের দিকে নিয়ে যায়।
৭️⃣ শরীরও স্থায়ী নয়
বাণীতে নিজের শরীরকেও “আমার” বলে আঁকড়ে ধরার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু শরীর পরিবর্তনশীল।
শৈশব থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্য—শরীর প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।
গীতায় বলা হয়েছে—
“দেহিনোऽস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা…”
অর্থাৎ দেহের মধ্যে শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য আসে; দেহ পরিবর্তিত হলেও আত্মার প্রকৃতি আলাদা।
তাই শরীরের যত্ন নিতে হবে, কিন্তু শরীরকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করা উচিত নয়।
৮️⃣ সংসারকে কীভাবে দেখব?
তাহলে কি সংসার ছেড়ে দিতে হবে?
না।
বরং—
সংসারে থাকব,
পরিবারের যত্ন নেব,
নিজের কর্তব্য পালন করব,
সৎভাবে উপার্জন করব,
সকলের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করব—
কিন্তু অন্তরে স্মরণ রাখব—
“সবই তাঁর, আমি কেবল তাঁর কাজে নিয়োজিত।”
এই ভাবনাই সংসারকে সাধনায় রূপান্তরিত করতে পারে।
৯️⃣ “আমি” থেকে “তিনি”
আধ্যাত্মিক জীবনের একটি সুন্দর পরিবর্তন হলো—
“আমি করছি” → “তাঁর কৃপায় হচ্ছে।”
“আমার পরিবার” → “তাঁর দেওয়া পরিবার।”
“আমার সম্পদ” → “তাঁর দেওয়া সম্পদ।”
“আমার জীবন” → “তাঁর দেওয়া জীবন।”
এই পরিবর্তন অহংকারকে কমিয়ে কৃতজ্ঞতাকে বাড়িয়ে দেয়।
🌸 আজকের মূল শিক্ষা
আজকের বেদবাণী থেকে আমরা কয়েকটি কথা মনে রাখতে পারি—
১. সংসার ত্যাগ নয়, সংসারের মধ্যে কর্তব্য পালন করতে হবে।
২. পরিবারকে ঘৃণা করা নয়, ভালোবাসতে হবে।
৩. সম্পর্কের মধ্যে অহংকার ও অতিরিক্ত আমিত্ব কমাতে হবে।
৪. সবকিছুর মধ্যে গুরুর শক্তিকে অনুভব করার চেষ্টা করতে হবে।
৫. কর্ম করতে হবে, কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হওয়া উচিত নয়।
৬. নিজের সীমিত জ্ঞানের অহংকার না করে ভগবানের প্রতি সমর্পণ করতে হবে।
৭. সংসারের কাজের মধ্যেও ভগবানের স্মরণ রাখা যায়।
🕉️ শেষ কথা
প্রিয় দর্শক,
আমরা সংসারে থাকি, তাই সংসারের দায়িত্ব আমাদের পালন করতেই হবে।
কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেন আমরা ভুলে না যাই—
এই জীবন, এই পরিবার, এই সম্পর্ক, এই শরীর—সবই ক্ষণস্থায়ী।
তাই ‘আমার’ ভাবনার পরিবর্তে যদি আমরা বলতে শিখি—
“সবই তোমার, আমি তোমার কাজে নিয়োজিত।”
তাহলে সংসারের মধ্যেও শান্তি আসতে পারে, কর্মের মধ্যেও সাধনা হতে পারে এবং জীবনের প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যেই গুরুর উপস্থিতি অনুভব করার পথ খুলে যেতে পারে।
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের চরণে শতকোটি প্রণাম।
📖 গ্রন্থ-স্মরণ
“বাণীর আলোকে পথচলা – শ্রীশ্রী রামঠাকুরের পত্রাংশের ব্যাখ্যা”
লেখক: সুব্রত মজুমদার
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের বাণীকে সহজ ভাষায় বোঝার এই প্রচেষ্টা সকল গুরুপ্রেমী ও ভক্তের জন্য নিবেদিত।
🔔 SUBSCRIBE
ভিডিওটি ভালো লাগলে Like 👍, Share ↗️ এবং Subscribe 🔔 করুন।
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের বাণী ও আধ্যাত্মিক ভাবনা আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আমাদের সঙ্গে থাকুন।
কমেন্টে লিখুন — “জয় গুরু” 🙏
🌺 জয় গুরু। 🌺
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
Rating:






.jpg)
কোন মন্তব্য নেই: