Sri Sri Ram Thakur is a revered spiritual master whose teachings continue to inspire countless devotees across India and around the world. The website serves as a comprehensive digital platform dedicated to preserving, promoting, and sharing the divine life, teachings, philosophy, and spiritual legacy of Sri Sri Ram Thakur, lovingly known as Dayal Thakur, Sri Sri Kaibalyanath, and Sri Sri Satyanarayan by his followers. Born as Ram Chandra Dev in Dingamanik, Faridpur (present-day Bangladesh)

 

কৈবল্যধামের ইতিহাস | শ্রীশ্রী রামঠাকুরের পবিত্র আশ্রম প্রতিষ্ঠার অলৌকিক কাহিনী

কৈবল্যধামের ইতিহাস | শ্রীশ্রী রামঠাকুরের পবিত্র আশ্রম প্রতিষ্ঠার অলৌকিক কাহিনী

শ্রীশ্রী রামঠাকুরের লীলাভূমি ও ভক্তদের ত্যাগে গড়ে ওঠা মহাপবিত্র কৈবল্যধাম

🎥 ভিডিও দেখুন:

📜 :

শ্রীশ্রী রামঠাকুরের নরলীলার শেষ পর্বে প্রতিষ্ঠিত “শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম” শুধু একটি আশ্রম নয়, এটি ভক্তি, ত্যাগ, আধ্যাত্মিকতা ও ঐশ্বরিক নির্দেশনার জীবন্ত প্রতীক। বহু স্থান অনুসন্ধানের পর চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ঠাকুর নিজে এই পবিত্র স্থান নির্বাচন করেন। ভক্তদের অক্লান্ত পরিশ্রম, মহেন্দ্রলাল ঘোষালের পরিবারের দান, এবং ঠাকুরের আশীর্বাদে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে কৈবল্যধামের শুভ প্রতিষ্ঠা হয়। আজও এই ধাম লক্ষ লক্ষ ভক্তের আধ্যাত্মিক শক্তিকেন্দ্র।

— ✅ কৈবল্যধাম প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ✅ পাহাড়তলীর অলৌকিক পরিবেশ ✅ কৈবল্যশক্তি বটবৃক্ষের মাহাত্ম্য ✅ কামশ্রীকুণ্ডের আবির্ভাব ✅ শ্রীশ্রী রামঠাকুরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনা কৈবল্যধামের ইতিহাস অনেকদিন হইতেই ঠাকুর ভক্তদের বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন, স্থায়ী ভাবে বসবাস করিবার মত কোন স্থান বা আশ্রম ছিল না। কয়েকজন আশ্রিত মিলিয়া কাশীতে শিবালয় অঞ্চলে একটি দ্বিতল বাড়ী শ্রীশ্রী ঠাকুরের আশ্রমের উদ্দেশ্যে ক্রয় করিয়াছেন। ঢাকা নিবাসী শ্রদ্ধেয় শ্রীকান্ত বসু ঐ বাড়ীর তত্ত্বাবধান করিতেন। ঠাকুর ঐ বাড়ী পছন্দ করিলেন না। তাঁহার আদেশে বাড়ীটি বিক্রয় করিয়া দেওয়া হইল। ঠাকুরের জন্য একটি আশ্রমের বিশেষ প্রয়োজন মনে করিয়া আশ্রিতগণ সর্বদাই এ বিষয়ে আলোচনা করিতেন। ঠাকুরের সঙ্গে করিয়া আশ্রিতগণ এই উদ্দেশ্যে নানা স্থানে ঘুরিয়া বেড়াইতেন, কিন্তু পছন্দমত আশ্রমের উপযুক্ত স্থান পাওয়া যাইতেছিল না। সবাই আশ্রম তৈয়ার করিবার জন্য আগ্রহাম্বিত, যিনি যেখানে আছেন, সেখানেই আশ্রমের জন্য স্থানের অনুসন্ধান করিতেছেন। আশ্রিতগণ ঠাকুরের সহিত আশ্রম প্রতিষ্ঠা সমন্ধে প্রায়ই আলোচনা করিতেন। শ্রীশ্রী ঠাকুর চাঁদপুর হইতে কলিকাতার উপস্থিত হইলে ঠাকুরের আশ্রিত ভক্তিভাজন ঁপ্রভাত চন্দ্র চক্রবর্তী আশ্রমের নিমিত্ত পুরীর ইভেন্স যোগোদ্যান ক্রয় করিতে বলিলেন। উদ্যানটি শ্রদ্ধেয় ঁপ্রভাত বাবু’র এক ছাত্রের, তিন হাজার টাকা মুল্যে পাওয়া যাইবে। সমস্ত শুনিয়া শ্রীশ্রী ঠাকুর পুরী চলিয়া গেলেন। পুরীতে তখন শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁশ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় ও শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁভুবনমোহন মুখোপাধ্যায় কনট্র্যাক্টরী করিতেন। ঠাকুর তাঁহাদের বাসার সংলগ্ন এক রাজার বাড়ীতে উঠিয়াছিলেন। এই শ্রদ্ধেয় শ্যাঁমাচরণ চট্টোপাধ্যায়’ই শ্রীশ্রী কৈবল্যধামের দ্বিতীয় মোহান্ত পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন এবং শ্রদ্ধেয় ঁভুবনমোহন মুখোপাধ্যায় প্রথমে পাহাড়তলী কৈবল্যধামবাসী ছিলেন এবং পরে কলিকাতা যাদবপুর কৈবল্যধামে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বাস করিয়াছিলেন। ঠাকুর পুরী পৌঁছিবার পরদিন শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁশ্রীরোহিণীকুমার মজুমদার কে শীঘ্র পুরী যাইবার জন্য চাঁদপুরে তার করিলেন। তার পাইবার পরদিনই শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁশ্রীরোহিণীকুমার মজুমদার চাঁদপুর হইতে পুরী রওনা হইলেন। দুইদিন পরে ষ্টেশনে পৌঁছিয়া দেখিলেন শ্রীশ্রী ঠাকুর, শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁশ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় ও শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁভুবনমোহন মুখোপাধ্যায় সঙ্গে করিয়া পুরী ষ্টেশনে উপস্থিত রহিয়াছেন। অতঃপর সবাই ঠাকুরের সহিত সেই রাজবাড়ীতে পৌঁছলেন। ঠাকুরের মুখে ঐ যোগোদ্যানের কথা শুনিলে, সবার মনে হইল খুব সস্তায় ঐ স্থান পাওয়া যাইবে। পরের দিন ঐ স্থান দেখিতে যাইবার ব্যবস্থা করা হইল। পুরী হইতে ২৪ মাইল দূরে এই যোগোদ্যান অবস্থিত। যাতায়াতের কোন রাস্তা তৈয়ার হয় নাই। বরাবর বালির মাঠের উপর দিয়া যাইতে হইবে। এক মাত্র গরুর গাড়ী ছাড়া অন্য কোন যানবাহনাদি ছিল না। শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁশ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় একটি গরুর গাড়ী ঠিক করিলেন। পরদিন খাওয়া-দাওয়া শেষ করিয়া শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁশ্রীরোহিণীকুমার মজুমদার, ঁশ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় ও ঁভুবনমোহন মুখোপাধ্যায় শ্রীশ্রী ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া গরুর গাড়ীতে ঐ উদ্যান অভিমুখে যাত্রা করিলেন। ঠাকুর ঐ বাড়ীতেই রহিলেন। তাঁহারা কিছুদূর গ্রামের মধ্য দিয়া চলিলে এক বিস্তৃত বালুকাময় প্রান্তর পাইলেন। সম্মুখে যতদূর দেখা যায় বৃক্ষাদির চিহ্নমাত্র নাই। চারিদিকে শুধু পাথুরে বালি, ইহার উপরে শয়ন করিলেও গায়ে লাগে না। তাঁহারা প্রায় ছয় মাইল পথ অতিক্রম করিয়াছেন, সূর্য তখন অস্তাচলের পথে, বহু বন্য হরিণ চারিদিকে বিচরণ করিতেছিল, গরুর গাড়ীতে মানুষ দেখে তাহারা অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। জীবনে আর কোন দিন ঐ রকম হরিণ তাঁহাদের কেহ দেখেন নাই। চারিদিকে মনোরম পরিস্থিতি সকলকে বেশ আনন্দ দান করিতেছিল। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়াছে, ঊনারা গরুর গাড়ীতে করিয়াই একটি নদী পার হইলেন। নদীতে হাঁটু জল, নদীটি একটু দূরেই সমুদ্রে মিলিত হইয়াছে বলিয়া এত অগভীর। রাত্রি প্রায় নয়টার সময় ঊনারা যোগোদ্যানে পৌঁছিলেন। অতি নিকটেই সমুদ্রের গর্জন শোনা যাইতেছিল কিন্তু রাত্রির অন্ধকারে চতুর্দিক ঘুরিয়া দেখা সম্ভব হইল না। ঐ উদ্যানের রক্ষকই রাত্রিতে ডাল-ভাত রান্না করিয়া সবার আহারের বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতারা ঐ স্থান ক্রয় করিতে আসিয়াছেন জানিয়া সে রক্ষক কোন রূপ অসুবিধায় পড়িতে দেয় নাই। ঐ উদ্যানে দুইখানি পাতার ঘর ছিল। যে ঘরখানিতে ইভেন্স সাহেব থাকিতেন সেই ঘরেই শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতাদের শয়নের বন্দোবস্ত করা হইল। ঐ সাহেব বাঁশের মাচার উপর তৃণশয্যায় শয়ন করিতেন। সেই মাচার উপরেই কম্বল পাতিয়া শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতাগণ শয়ন করিলেন। সবাই ক্লান্ত, রাত্রিতে বেশ ভাল ঘুম হইয়াছে। সকালে নিদ্রাভঙ্গের পরে হাত-মুখ ধুইয়া তিন জনে চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিতে লাগিলেন। স্থানটি ঊনাদের বড়ই মনোরম লাগিল। সমুদ্রতীরে চল্লিশ বিঘা জমির একটি বালির পাহাড়ের উপর এই উদ্যানটি অবস্থিত। সমুদ্রের গর্জন শোনা যাইতেছে, সমুদ্রের ধারে নারিকেল-ভর্ত্তি অসংখ্য নারিকেল গাছ সারি সারি দণ্ডায়মান। গাছগুলি ছোট, হাত দিয়া নারিকেল ধরিতে পাওয়া যায়। পাহাড়ের উপর চতুর্দিকে অসংখ্য বৃক্ষ, নানারকম তরকারি ও শাকসবজি হইয়া আছে। গুরুভ্রাতাগণ ফিরিবার সময় প্রায় আঠার সের ওজনের একটি কুমড়া লইয়া আসিয়া ঠাকুরকে দেখাইয়াছিলেন। চতুর্দিকে অসংখ্য কদলী বৃক্ষের সমাবেশ। ঐ স্থানে দুইটি শিবমন্দির বিদ্যমান, বহুদিনের পুরাতন মন্দির। মন্দির দুইটির চতুর্দিকে বালি জমিয়া জমিয়া প্রাচীরের আকার ধারন করিয়াছে, তাই নীচে নামিয়া মন্দিরে প্রবেশ করিতে হয়। মন্দিরে শিবলিঙ্গ ও সর্পের মূর্তি আছে। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বহু ভক্ত আসিয়া মন্দিরে পূজা দিয়া যায়। এই স্থানে পূজা দিলে নাকি ভবিষ্যতে সর্পদংশের ভয় থাকে না। পরিষ্কার খোলা জায়গায় একটি বটবৃক্ষের গোড়া বাঁধন, ঐ স্থানে সর্বদা ইভেন্স সাহেব ও তাঁহার স্ত্রী ধ্যানমগ্ন হইয়া বসিয়া থাকিতেন। এই পাহাড়টির ধার দিয়া একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বতী নদী প্রবাহিত হইয়া সমুদ্রে মিলিত হইয়াছে। নদীর জল এতই লবনাক্ত যে, মুখে দিলে মুখ জ্বালা করে। আবার ঐ বালির পাহাড়ের ধার দিয়া একটি ঝরনা হইতে নির্মল জল পরিতেছে। এই লবণাক্ত নদী ও সমুদ্রের এত নিকটে যে এইরূপ ঝরনা থাকিতে পারে তাঁহারা কেহ কল্পনাও করিতে পারেন নাই। চারিদিকের এই মনোরম দৃশ্য দেখিয়া স্থানটি ঊনাদের তিন জনেরই খুব পছন্দ হইল। কিন্তু এই স্থানে বাস করা নিরাপদ নয়, চোর–ডাকাতের ভয় আছে। বেলা প্রায় আটটা বাজে, শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতাগণ পুরী ফিরিবার উদ্যোগ করিতেছেন এমন সময় উদ্যানরক্ষক ঊনাদের জন্য পাকা কলা, গোদুগ্ধ ও চিঁড়া আনিয়া হাজির করিয়াছে। চিঁড়াগুলি মোটা মোটা ও বালু মিশ্রিত হইলেও অত্যধিক ক্ষুধার উদ্রেক হওয়াতে গুরুভ্রাতাগণ অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করিয়া দুধ, চিঁড়া ও কলা একত্রে মিশ্রিত করিয়া ভক্ষণ করিতে লাগিলেন। একটু বিশ্রামের পর গরুর গাড়ীতে আরোহণ করিলে উদ্যান রক্ষক ঊনাদের নমস্কার জানাইয়া নিবেদন করিল যে, যদি শ্রীশ্রী ঠাকুর ও শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতাগণ এই স্থান ক্রয় করেন তবে তাহাকে যেন রাখা হয়। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক গাড়ীতে চলার পর উনাদের আবার ক্ষুধার উদ্রেক হইল। গতকল্যকার দেখা সেই অগভীর নদীর ধারে আসিয়া একটি দোকান হইতে কিছু খাবার কিনিয়া খাইলেন। নদীটি পার হইয়া বালুকাময় মাঠের ভিতর দিয়া গাড়ী চলিতেছে, চারিদিকে অসংখ্য হরিণ চরিতেছে। গাড়ী চলিতেছে, আর শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁশ্রীরোহিণীকুমার মজুমদার গাড়ীকে অনুসরণ করিয়া হরিণগুলিকে তাড়াইয়া লইয়া যাইতেছেন। হরিণগুলি বেশ কিছু দূর আসিয়াছিল। পুরী পৌঁছিতে যখন প্রায় পাঁচ মাইল বাকী তখন হরিণগুলি পিছন ফিরিয়া দৌড়াইল। আশ্চর্য ! আর তাহাদের কিছুতেই ফিরাইতে পারিলেন না। শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতাগণ বেলা পাঁচটার সময় পুরী আসিয়া শ্রীশ্রী ঠাকুরের পদধূলি নিলেন। উদ্যানের সব বিবরণ শুনিয়া ঠাকুরের পছন্দ হইলে বাগানের মালিকের নিকট লোক পাঠান হইল। উদ্যানটির মূল্য প্রথমে তিন হাজার টাকা স্থির হইয়াছিল এবং শ্রীশ্রী ঠাকুর ও শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতাগণ ঐ মূল্যে স্থানটি ক্রয় করিতে রাজি হইলেন। জমিদার তখন পাঁচ হাজার টাকা দাবী করিলেন| পাঁচ হাজার টাকা দিতে সম্মত হইলে মালিকের দাবী সাত হাজার টাকায় গিয়া পৌঁছিল। জমিদারের এই ব্যবহারে শ্রীশ্রী ঠাকুর অত্যান্ত বিরক্ত হইয়া বলিলেন “এ স্থান লইবার দরকার নাই।” জমিদারকে অভিমত জানাইয়া দেওয়া হইল। এর কিছুদিন পর শ্রীশ্রী ঠাকুর চাঁদপুরে শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁশ্রীরোহিণীকুমার মজুমদার এর বাসায় আসিয়াছেন। দুই-একদিন পরে ঢাকা কমলাপুর হইতে শ্রদ্ধেয় ঁসুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য (অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি পুলিশ সুপারিটেনডেন্ট) চিঠি লিখিয়া ঠাকুরকে জানাইলেন, “কমলাপুরের নিকটবর্তী ধোলাইগঞ্জে আশ্রমের উপযুক্ত একটি স্থান ষোল হাজার টাকায় পাওয়া যায়।” শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা, নোয়াখালির তদানীন্তন সরকারী উকিল ঁশুভময় দত্ত সেদিন চাঁদপুরে ঊনার বাসায় উপস্থিত। ঠাকুরের আশ্রিতের সংখ্যা তখন খুবই সীমাবদ্ধ; চিন্তিত হইয়া আশ্রিতগণ শ্রদ্ধেয় ঁশুভময় দত্তের সামনেই ঠাকুরকে বলিলেন, “এই ষোল হাজার টাকা কোথায় পাইব?” এই কথা শ্রবনমাত্র শ্রদ্ধেয় ঁশুভময় দত্ত বলিলেন, “চিন্তার কোন কারণ নাই, আমি এই ষোল হাজার টাকা দিব।” শ্রদ্ধেয় ঁশুভময় দত্তের এই আশ্বাসবাণীতে তাঁহারা সকলেই বড়ই আনন্দিত হইয়াছিলেন। পরের দিনই শ্রীশ্রী ঠাকুর, গুরুভ্রাতা ঁশুভময় দত্ত ও অন্য কয়েকজন আশ্রিত ভক্তকে লইয়া ঢাকার কমলাপুরের শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁসুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্যের বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন। আশ্রিতগণ ঠাকুরকে সঙ্গে করিয়া নানাস্থানে ঘুরিয়া দেখিলেন কিন্তু কোন স্থানই ঠাকুর আশ্রমের উপযুক্ত মনে করিলেন না। ঠাকুর আবার চাঁদপুরে ফিরিয়া আসিলেন। অনেক শহর ঘুরিয়াও আশ্রমের উপযুক্ত কোন স্থান না পাওয়াতে সকলেই দুঃখিত ও চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। কয়েকদিন পরে চট্টগ্রামের তদানীন্তন ইনকামট্যাক্স অফিসার শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁমনীদ্রকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় একখানি চিঠি লিখিয়া জানাইলেন, পাহাড়তলীতে আশ্রমের উপযুক্ত একটি পাহাড় আছে, এই পাহাড়টি শ্রদ্ধেয় ঁমহেন্দ্রনাথ ঘোষালের বিধবা পত্নী বিনা মূল্যে আশ্রমের উদ্দেশ্যে ঠাকুরকে দান করিতে চাহেন। দুই-তিন দিন পরে ঠাকুর কয়েকজন আশ্রিতকে সঙ্গে লইয়া চট্টগ্রামে শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা কনট্রাক্টর ঁবিধুভূষণ বসুর বাসায় উপস্থিত হইলেন। শ্রদ্ধেয় ঁমনীদ্রকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় আসিয়া ঠাকুরকে প্রনামান্তে নিবেদন করিলেন, শ্রদ্ধেয় ঁমহেন্দ্রনাথ ঘোষালের ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল এই পাহাড়টিতে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন, বহু চেষ্টা করিয়াও তাঁহার এই বাসনা সফল করিতে পারেন নাই। অল্প বয়সেই তিনি পরলোকগমন করিলে তাঁহার বিধবা সাধবী পত্নী শ্রদ্ধেয়া চপলা দেবী স্বামীর ইচ্ছা পূর্ণ করিবার জন্য পাহাড়টি আশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শ্রীশ্রী ঠাকুরকে দান করিতে আগ্রহান্বিতা হইয়াছেন। ঠাকুর দুই-তিন দিন পরে ঐ স্থান দেখিতে যাইবেন বলিয়া মত প্রকাশ করিলেন। এই সংবাদ চতুর্দিকে প্রচারিত হইল। ফেণী ও অন্যান্য স্থান হইতে আরও কয়েকজন গুরুভ্রাতা আসিয়া শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুর বাসায় উপস্থিত হইলেন। বহুদিন লোকজনের বাস না থাকায় পাহাড়টি জঙ্গলাকীর্ণ হইয়াছিল। ঠাকুর পাহাড়টি দেখিতে যাইবেন শুনিয়া শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু লোকজন দিয়া জঙ্গলগুলি পরিষ্কার করাইয়া দিলেন। একদিন বিকালবেলা শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু কয়েকজন আশ্রিত সহ ঠাকুরকে সেই পাহাড় দেখাইতে লইয়া গেলেন। বড় রাস্তা হইতে পাহাড়টির নিকটে গাড়ী পৌঁছিবার মত কোন ভাল রাস্তা না থাকায় ঠাকুরকেও ঊনাদের সহিত পদব্রজে পাহাড়ের নিকট পৌঁছিতে হইয়াছিল। ঠাকুর পাহাড়টিতে পাঁচ-ছয় পা উঠিয়া চতুর্দিক অবলোকন করিলেন এবং ফিরিয়া পাহাড়ের তলদেশে একটি বটবৃক্ষের মূলে উপবেশন করিলেন। এই বটবৃক্ষই “কৈবল্যশক্তি” নামে অভিহিত হইয়াছে। গুরুভ্রাতারা সকলেই চতুর্দিক ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিতেছিলেন। গ্রীষ্মকাল, সবে মাত্র বসন্ত শেষ হইয়াছে। প্রতিটি গাছের পাতায় পাতায় সবুজ লাগিয়াছিল। পাহাড়ের চারিদিকে ফল ও ফুল গাছের অন্ত নাই, আমগাছ আম্রভরে ছিল নত, জামগাছে ছিল অফুরন্ত জাম, বেলগাছের মাথায় মাথায় বেলের অন্ত ছিল না। লিচু, পেয়ারাও কুলগাছ ছিল অনেক। গাছেরও ছিল না অন্ত, ফলেরও ছিল না শেষ। ফুলগাছেও ফুল ছিল অপর্যাপ্ত, অপরূপ শোভায় শোভিত হইয়া আপন গন্ধে আমোদিত করিয়া দিয়াছিল। এ ছাড়াও অনেক রকমের গাছ থাকায় ঐ স্থানটিকে অলকানন্দার তীরে নন্দন কানঙ্কেই মনে করাইয়া দিতেছিল। আশেপাশে আরও অনেক ছোট-বড় পাহাড় দেখা যাইতেছিল, মনে হইল যেন “থরে থরে বিথরে বিথরে বিরাজিছে গিরিরাজি”। শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতাগণ পাহাড়ের উপর উঠিয়া দেখিলেন বেড়াশূন্য একখানি চৌচালা টিনের ঘরের মধ্যস্থলে একটি বেদী বিদ্যমান। স্থানটিতে একজন সাধু থকিতেন। কালক্রমে ঐ সাধুর এই স্থান পরিত্যাগের পরে পাহাড়টি এই ভাবে পড়িয়া রহিয়াছে। চতুর্দিকের দৃশ্যও অতীব মনোরম। পাহাড়টির অতি নিকট দিয়া রেল লাইন গিয়াছে, মনে হইল যেন দুইটি সমান্তরাল রেখা বহু দূর চলিয়া গিয়াছে। অনেক দূরে সমুদ্র দেখা যাইতেছিল, অসীম সমুদ্রের নীল জলরাশি মাঝে মাঝে ফুলিয়া গর্জিয়া উঠিতেছে, আপন গতিবেগে আবার শান্ত হইয়া যাইতেছে। কভু বা শান্ত, কভু অশান্ত, আপন ছন্দে চলে। ঐ জলরাশির উপর দিয়া বহু নৌকা ও জাহাজ চলাচলের দৃশ্যও মনোরম। সূর্যদেবের অস্তাচলে যাওয়ার দৃশ্যও সে দিন মনে হইল যেন সারাদিনের পরিশ্রমের পরে সূর্যদেব শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহে সমুদ্রের শীতল জলে অবাহগন করিতে চলিয়াছেন। পাহাড়টিও সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল সবুজ মাঠ ও ছোট ছোট গ্রাম। গ্রামগুলির মধ্যে কাঠটুলি অন্যতম। গ্রামগুলি সবই বড় বড় বৃক্ষরাজির সবুজ পাতায় ঢাকা। নানা রকম পাখির কলতানে চারিদিক ছিল মুখর। প্রকৃতির সকল রকম সৌন্দর্যের বস্তুই ঐখানে বিরাজ করিতেছিল। উপস্থিত সকলেই মনে মনে ঠিক করিলেন এই পাহাড়টিই আশ্রমের উপযুক্ত স্থান, ঠাকুর নিশ্চয় ঐ স্থানটি পছন্দ করিবেন। ঐ পাহাড়ের তলদেশে আবদুল নামে একজন মুসলমান ভদ্রলোক সপরিবারে বাস করিতেন। আবদুল সেখানে উপস্থিত হইলে ঠাকুর তাঁহাকে এমনভাবে আলিঙ্গন করিলেন, মনে হইল আবদুল তাঁহার বহু দিনের পরিচিত। ঠাকুর আবদুলকে বলিলেন, “এই স্থানেই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হইবে, আশ্রমের সমস্ত কায্যে আপনি ভক্তদের সাহায্য করিবেন, এই আশ্রমের ভালমন্দের দিকে লক্ষ্য রাখিবেন।” আবদুল নতমস্তকে ঠাকুরের আদেশে সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। অবশেষে আশ্রমের জন্য এই স্থানটি শ্রীশ্রী ঠাকুরের পছন্দ হইয়াছে জানিয়া সকলের কি আনন্দ। আশ্রিতরা সবাই ঠাকুরের সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন, পরে সবাই ঠাকুরের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুর বাড়ীতে ফিরিয়া আসিলেন। সেখানে উপস্থিত সকলেই আশ্রমের নির্মাণ কায্যশীঘ্রই আরম্ভ করিতে হইবে বলিয়া স্থির করেন। শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুরই উৎসাহ ছিল সর্বাধিক। পর দিন শ্রীশ্রী ঠাকুর চট্টগ্রাম হইতে চাঁদপুরে ফিরিয়া আসেন। আট-দশ দিন পরেই সংবাদ পাইলেন শ্রদ্ধেয় বিধুভূষণ বসু আশ্রমের নির্মাণকায্য আরম্ভ করিয়াছেন। ঠাকুর এই আশ্রমকে “কৈবল্যধাম” নামে আভিহিত করিলেন। ঠাকুরের আদেশে ১৩৩৭ সালের ১০ই শ্রাবণ, শুক্রবার এই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। কৈবল্যনাথের চিত্রপট প্রতিষ্ঠা করিয়া উৎসব করা হয়। সমগ্র স্থানটি কীর্তনোৎসবে মুখরিত হইয়াছিল। পাহাড়ের উপরে শ্রী ঁমহেদ্রনাথ ঘোষালের বেড়াশূন্য চৌচালা টিনের ঘরটিকে শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু মেরামত করাইয়া চতুর্দিকে বেড়া দেওয়াইলেন, একখানি রান্নাঘর তৈয়ার করাইলেন। একটি নলকূপ খনন করাইলেন। চারিদিকে পরিষ্কার করাইয়া পাহাড়ের উপর উঠিবার সরু রাস্তাটিরও সংস্কার করাইলেন। হাতে সময় অতি সংক্ষিপ্ত, ১০ই শ্রাবণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা, সুতরাং মন্দির বা অন্য কোন ঘর তৈয়ার করা সম্ভব নয়। একমাত্র শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুর আপ্রাণ চেষ্টায় ঐভাবে ১০ই শ্রাবণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হইয়াছিল। তিনি আজ পরলোকে কিন্তু আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁহার অদম্য উৎসাহ ও প্রচেষ্টা চিরস্মরণীয়। শ্রীশ্রী ঠাকুরের আদেশে শ্রীমৎ ঁহরিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় কৈবল্যধামের প্রথম মোহন্ত পদে অধিষ্ঠিত হন। এই উৎসব উপলক্ষেই তিনি প্রথমে আশ্রমে আসেন। ফেনী নিবাসী শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা শ্রী ঁযামিনীরঞ্জন আদিত্য শ্রীশ্রী ঠাকুরের আদেশে সংসার ত্যাগ করিয়া আশ্রমবাসী হইয়াছিলেন। বিশেষ করিয়া, শ্রদ্ধেয় ঁহরিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় এর দেখাশুনার ভার শ্রদ্ধেয় ঁযামিনীরঞ্জন উপর ন্যাস্ত হইল এবং ঐ দিনই বাসুদেব নামে একজন বিহারী ব্রাহ্মণ এবং দুই-তিন দিন পর রূপলাল নামে একজন সাঁওতাল চাকর নিযুক্ত হয়। শ্রীশ্রী ঠাকুর আশ্রমে প্রবেশ করেন কিছুদিন পরে। শ্রীশ্রী ঠাকুরের আশ্রম প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত আশ্রমের যাবতীয় খরচ শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু প্রায় একাই বহন করিয়াছিলেন। কোথায় ঠাকুর-মন্দির হইবে, কোথায় পুরুষ ও মহিলা ভক্তগণের পৃথক পৃথক থাকিবার স্থান হইবে। কোথায় বা নলকূপ খনন করা হইবে, সবই শ্রীশ্রী ঠাকুর স্বহস্তে আঁকিয়া শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুকে দেখাইয়া দিয়াছিলেন। আশ্রম প্রতিষ্ঠার কয়েক মাস পরে কয়েক জন ভক্ত মিলিয়া স্থির করেন যে, আশ্রমের জন্য অন্ততঃ ২০,০০০ (কুড়ি হাজার) টাকার প্রয়োজন। শীঘ্রই যাহাতে এই টাকা সংগৃহীত হয় তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। সভায় প্রথমে মোহন্ত মহারাজ বিদেহী শ্রীমৎ ঁহরিপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, কমিটির সভাপতি; শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু, সহঃসভাপতি; শ্রদ্ধেয় ঁযোগেশচন্দ্র গুপ্ত (তৎকালীন মাহুড কোম্পানির ম্যানাজার), সম্পাদক; শ্রদ্ধেয় ঁরায় বাহাদুর ঁশুভময় দত্ত, কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ঐ বৎসরই ১৫ই ফাল্গুন ঠাকুর আশ্রমে প্রবেশ করিবেন জানিয়া যাহাতে তাহার পূর্বে মন্দির, ঠাকুরের শয়নঘর ও আগন্তকদের থাকিবার ঘরের নির্মাণকায্য শেষ হয় তাহাদের জন্য শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করিলেন এবং যথা সময়ে সমাধাও করিলেন। মন্দিরের নক্সা করিয়া দিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁযোগেশচন্দ্র গুহ। তাঁহারই তত্ত্বাবধানে শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু, শ্রদ্ধেয় ঁসুরেশচন্দ্র গুহ, ওভারসীয়ার ও ঁহীরালাল বসু মহাশয়ের সাহায্যে সমস্ত নির্মাণকায্য নির্বাহ করিয়াছিলেন। শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু ও তাঁহার সহকারী স্মৃতি মন্দিরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রহিয়াছে। কৈবল্যধামে ১৫ই ফাল্গুনের ২/৩ দিন পূর্বব হইতেই লোক সমাগম আরম্ভ হইয়াছিল। ঠাকুর নোয়াখালি হইতে রওনা হইলেন। আর শ্রীশ্রী ঠাকুরের কয়েকজন আশ্রিত চট্টগ্রাম মেইলে চাঁদপুর হইতে চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হইলাম। তাঁহারা একটি লম্বা তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় উঠিয়াছিলেন, বিশেষ ভিড় নাই। লাকসাম ষ্টেশনে গাড়ী পৌঁছিলে চাঁদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চৌমুহনীর সব ভক্তই ঠাকুরকে ঘিরিয়া এক গাড়ীতে উঠিলেন। ফেনী ষ্টেশনেও অনেক ভক্ত ঐ কামরায় উঠিয়াছিলেন। ট্রেনখানি পরদিন বেলা প্রায় নয়টার সময় কৈবল্যকুণ্ডের পশ্চিম পাড়ে খোল-করতাল সহযোগে মধুর কীর্তন চলিতেছে। ট্রেন ধীরে ধীরে চলিতেছে। দূর হইতে শ্রীশ্রী ঠাকুরের প্রতি আঙ্গুলী নির্দেশ করিতেই সবাই পরম আনন্দে নৃত্য করিয়া উদ্দাম কীর্তনে মত্ত হইয়াছিলেন! কৈবল্যধাম দেখিয়াই ঠাকুর যেন ভাবাবিষ্ট হইয়া পড়িলেন। ঠাকুরকে ধরিয়া বসিয়াছিলেন, জীবনে আর কোন দিন ঠাকুরের এমন অবস্থা আশ্রিতরা কেউ দেখেন নাই। পাহাড়তলী ষ্টেশনে ট্রেনটি পৌঁছিলে শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতারা প্রায় সকলেই নামিয়া কৈবল্যধাম চলিয়া গেলেন। কয়েকজন ঠাকুরকে লইয়া চট্টগ্রাম পৌঁছিলে শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু মোটরে করিয়া ঊনাদের তাঁহার বাসায় লইয়া গেলেন। ১৫ই ফাল্গুন শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুর নিজস্ব গৃহপ্রবেশের দিন ছিল। ঐদিন প্রথমে ঠাকুরকে লইয়া শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু আপন গৃহ-প্রবেশ করিলেন। পরে প্রায় বেলা নয়টার সময় শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুর নিয়োজিত একখানি বড় মোটর গাড়ী করিয়া ঠাকুর শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসু ও অন্যান্য ভক্তকে সঙ্গে লইয়া কৈবল্যধামের পাদদেশে আসিলেন। উদ্দাম কীর্তন, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি সহযোগে উপস্থিত সবাই ঠাকুরকে অভ্যর্থনা করিলেন। পাহাড়ের উপর উঠিবার সময় ঠাকুরের শ্রীদেহে ফুল ও নানা গন্ধদ্রব্য ছড়ান হইয়াছিল। সেখানে এক বিমল আনন্দের স্রোত বহিতেছিল। নান স্থান হইতে বহু আশ্রিত ভক্ত আসিয়াছেন। স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় অস্থায়ীভাবে টিনের আচ্ছাদন তৈয়ার হইয়াছিল। তখনও হিমের আমেজ ছিল। ঐ আচ্ছাদনের মধ্যে খড় বিছাইয়া সকলে বিছানা করিয়া রাত্রিতে শয়ন করিতেন। আশ্রিতদের মধ্যে ভেদাভেদের চিহ্নমাত্র ছিল না, সবাই যেন একই পরিবারের লোক আর তাহাদের একমাত্র কর্তা শ্রীশ্রী ঠাকুর। ঠাকুরের চিন্তাই সকলের মনকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। তিন দিন ধরিয়া চলিল মহোৎসব। প্রসাদ বিতরণের সময় অসংখ্য লোক উপস্থিত হইল। তখন কৈবল্যধামের স্থান খুবই সঙ্কীর্ণ ছিল। প্রসাদ পাইবার জন্য লোকের এত আগ্রহ আর কেহ কোন দিন দেখেন নাই। একবার কলার পাতা পাতিয়া আর উঠাইতে হইল না। একই পাতাতে প্রত্যহ রাত্রি বারোটা পর্যন্ত সবাই প্রসাদ গ্রহণ করিয়াছিলেন। জীবনে অনেক মহোৎসব হইয়াছে কিন্তু আর কোন দিন ঐভাবে একই পাতায় বার বার প্রসাদ পাইতে দেখা যায় নাই। সমস্ত দিন ধরিয়া প্রসাদ বিতরণ করা হইয়াছিল। কিন্তু কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য কোথাও কোন অসুবিধা ঘটিতে পারে নাই। রাত্রিতে আশ্রিতদের কয়েকজন একেবারেই শয়ন করেন নাই। তাঁহারা সারা রাত্রি ধরিয়া আশ্রমবাসীদের নিরাপত্তার জন্য পাহারায় ব্যাপৃত ছিলেন। তিন দিন ধরিয়া একই ভাবে মহোৎসব চলিয়াছিল। শ্রীশ্রী ঠাকুর মাত্র তিন দিন তিন রাত্রি স্থূলভাবে কৈবল্যধামে বাস করিয়াছিলেন। পরদিন সকালে চট্টগ্রামে শ্রদ্ধেয় ঁবিধুভূষণ বসুর বাসায় চলিয়া যান। চাঁদপুরে ফিরিয়া আসিবার পরে ঠাকুর বলিয়াছেন, আর কোনদিন স্থুল শরীরে কৈবল্যধামে যাইবেন না। এই সংবাদে সকলে খুবই দুঃখিত হইলেন। গুরুভ্রাতাদের একান্ত ইচ্ছা, ঠাকুর নানাস্থানে না ঘুরিয়া কৈবল্যধামে বাস করিবেন এবং সবাই সময়মত তাঁহার শ্রীচরণ দর্শন করিতে পারিবেন। এই আশা করিয়াই তাঁহার সম্মিলিত চেষ্টায় এই কৈবল্যধামের নির্মাণকায্য সমাধা করিয়াছেন। ঠাকুর বলিলেন, যেমন বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়া বেড়ান এখনও সেইরূপ ঘুরিয়া বেড়াইবেন। আর কোন দিন শ্রীশ্রী ঠাকুর ঐ কৈবল্যধামে স্থুল শরীরে প্রবেশ করেন নাই। এরপর একদিন ঠাকুর চাঁদপুরে শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা শ্রী ঁরোহিণীকুমার মজুমদারের ঘরের মধ্যে বসিয়া আছেন, শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা কৈবল্যধাম সম্বন্ধে নানা গল্প করিতে করিতে ঠাকুরকে বলিলাম, “কৈবল্যধামে কোন ঝরনা নাই, পুরীতে ইভেন্স যোগোদ্যানে একটি সুন্দর ঝরনা আছে।” ইহা শুনিয়া ঠাকুর একটি সুন্দর গল্প বলিলেন, এক মহাপুরুষ তাঁহার শিষ্যবৃন্দসহ ঘুরিয়া ঘুরিয়া একটি পাহাড়ের উপর বিশ্রাম করিতেছিলেন। শিষ্যগন জলপিপাসায় কাতর হইয় চতুর্দিকে জল অন্বেষণ করিল। কোথাও জলের সন্ধান না পাইয়া পিপাসাসারত্ত শিষ্যগন গুরুদেবকে জানাইল যে, তাহারা পিপাসায় কাতর কিন্তু জল পাওয়া যাইতেছে না, গুরুদেব বলিলেন, “নিকটেই জল আছে, খুঁজিলেই পাইবে।” শিষ্যগন আবার জলের সন্ধান করিয়া বিফল মনোরথ হইল এবং পুনরায় তাহার গুরুদেবকে এই সংবাদ জানাইল, কিন্তু গুরুদেব আর কোন কোথাই বলিলেন না। কোন উপায় না দেখিয়া শিষ্যগন হতাশ মনে গুরুদেবের পার্শ্বেই বসিয়া রহিল। তাহারা যে স্থানে বসিয়াছিলেন, মনে হইল যেন তাহারই নীচে কুল কুল ধ্বনিতে জল চলাচলের শব্দ হইতেছে। চারিদিকে চাহিয়া তাহারা দেখিতে পাইল তাহাদের অতি নিকটে একটি প্রস্তর খণ্ডের তলদেশ হইতে জলের ফোয়ারা বাহির হইতেছে। শিষ্যগন পরম আনন্দে সেই জল পান করিল। শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা শ্রীঁরোহিণীকুমার মজুমদার এই গল্প শুনার পরেও বুঝিতে পারেন নাই যে, কৈবল্যধামেও ঐরকম একটি ঝরনার উৎস বাহির হইবে। কিছুদিন পর কৈবল্যধাম হইতে সংবাদ আসিল কৈবল্যধামের পাহাড় হইতে একটি ঝরনা বাহির হইয়াছে। ঠাকুর ঝরনাটিকে কামশ্রীকুণ্ড নামে অভিহিত করিয়াছেন। এই কামাশ্রীকুণ্ডকে খনন করিয়া বাঁধাইয়া শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা পরম ভক্ত কন্ট্রাক্টর রায় বাহাদুর শ্রীঁরবীন্দ্রকুমার মিত্র অক্লান্ত পরিশ্রম ও বহু অর্থ ব্যয় করিয়াছিলেন। গুরুভ্রাতাদের ঐকান্তিক চেষ্টায় দিনে দিনে আশ্রমের কলেবর অনেক বৃদ্ধি পাইয়াছে। শ্রীশ্রীঠাকুর নরলীলার শেষ পর্বে নরলীলার শেষ পর্বে, শ্রীশ্রীঠাকুর তখন ভাবতে থাকেন একটা ভালো জায়গায় একটা আশ্রম প্রতিষ্ঠা করার কথা। তাঁর এই ইচ্ছা তিনি প্রকাশ করেছিলেন ঘনিষ্ঠ ভক্তদের কাছে। ভক্তরা অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে খুঁজতে থাকেন কোথায় পাওয়া যেতে পারে সেই জায়গা। কিন্ত ভক্তদের নির্বাচিত জায়গাগুলো ঠাকুরের তেমন পছন্দ হচ্ছিল না। অবশেষে একদিন, ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে নিয়ে অধুনা বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ও তার আশেপাশে অনেকগুলি জায়গা ঘুরে দেখার পর ঠাকুর যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন একটা বট গাছের নিচে, তখন নিজেই পাহাড়তলির একটা পাহাড়ের মাথায় একটা জায়গা চিহ্নিত করে দেন তাঁর আশ্রমের জন্য। পরবর্তীকালে সেই আশ্রমের নামকরণ হয় "শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম" আর বটগাছটির নাম হয় "কৈবল্য শক্তি"। একান্ত জনবিরল সেই জায়গাটির মালিক ছিলেন শ্রী মহেন্দ্রলাল ঘোষাল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী চঁপলা দেবী ও পুত্র হাঁরাধান ঘোষাল তাঁদের শ্রদ্ধার দান হিসেবে শ্রীশ্রীঠাকুরকে জায়গাটি দিয়েছিলেন। পাহাড়টা ঢাকা ছিল ঘন জঙ্গলে আর সেখানে ছিল কিছু হিংস্র জন্তুজানোয়ার। জায়গাটা দ্রুত পরিষ্কার করার পর একটা ছোট মন্দির গড়া হলে অধিকাংশ ভক্ত চাইলেন ১৯৩০ সালের এপ্রিল বা মে মাসে একটা শুভ দিন দেখে শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম উদ্বোধন করা হোক। ঠাকুর কিন্তু ঘোষণা করলেন যে, ঊদ্বোধন হবে ১৯৩০-এর ২৬শে জুলাই এবং সেই দিনই আশ্রমের উদ্বোধন হয়েছিল যদিও সেই অনুষ্ঠানে ঠাকুর উপস্থিত থাকতে পারেননি। ১৯৩১ ফেব্রুয়ারী মাঝামাঝি (১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১৫ই ফাল্গুন) শ্রীশ্রীঠাকুর মন্দিরে যান ও কয়েকদিন থাকেন। পরে আর কখনও যাননি। পরবর্তীকালে ভক্তদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মূল মন্দির, অতিথিশালা ও চারপাশের পাঁচিল তৈরি করা হয়। রাস্তাও তৈরি করা হয় জঙ্গল পরিষ্কার করে। সে-বছর (১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) দেবী দুর্গার মূর্তি উপাসনা করে দুর্গা পূজাও করা হয়। তিন বছর এ-ভাবেই পূজো হয়; তারপর আর দেবী দূর্গার মূর্তি গড়ে নয়, প্রতি বছর শ্রীশ্রীকৈবল্যধামের বিগ্রহের পাশে ঘট রেখে ঐ পূজার উৎসব পালন করা হচ্ছে। এটি আবার পাহাড়তলির শ্রীশ্রীকৈবল্যধামের বার্ষিক উৎসবও বটে এবং এটি চলে পাঁচ দিন ধরে। ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত সমবেত হন এবং উৎসব চলার দিনগুলিতে উপস্থিত ভক্তবৃন্দ সমস্ত দিনই প্রসাদ গ্রহণ করেন। তা ছাড়া প্রতি সপ্তাহান্তে হাজার হাজার ভক্ত মহাপ্রসাদ গ্রহণ করে থাকেন। ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড নামে সুপরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের পাশে কৈবল্যধাম রেল স্টেশনের খুব কাছেই শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম। ধামের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের দিগন্ত ছোঁয়া মনোমুগ্ধকর দৃশ্য; তেমনি আকর্ষণীয় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য। ঐ পাশেই রয়েছে "কৈবল্য শক্তি" নামের বটগাছটি এবং "কৈবল্য কুন্ড" নামে বড় একটা পুকুর; ভক্তরা সেখানে পুণ্যস্নান করে থাকেন। পুকুরের উত্তর দিকে "গয়াঘর" নামে একটা জায়গায় শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠান করা হয়। ঠাকুর বলেছিলেন যে, এখানে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হলে ভারতবর্ষের গয়ায় কাজ করলে যে সুফল লাভ হয় তেমনটাই হবে। পরবর্তীকালে আশ্রম প্রাঙ্গণে নির্মিত করা হয় হর-গৌরী মন্দির এবং অথিতি-ভক্তদের থাকা ও অন্যান্য ক্রিয়াকর্মের জন্য নতুন একটি ভবন। শ্রীশ্রীকৈবল্যধামের উদ্বোধনের আগেই শ্রীমৎ হরিপদ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঠাকুর ধামের প্রথম মোহান্ত হিসেবে মনোনীত করে রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন ঠাকুরের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। তিনি সেতার বাজিয়ে ভক্তিমূলক গান গাইতে ভালোবাসতেন এবং আধ্যাত্মিকতার রহস্য নিয়ে আলাপ-আলোচনা উপভোগ করতেন। ১৯৩৫-এর ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁর জীবনাবসান হলে ঠাকুরের নির্দেশে মোহান্ত হন শ্রীমৎ শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যয়। শ্রীমৎ চট্টোপাধ্যয় পঁচিশ বছর ধরে মোহান্ত ছিলেন এবং তাঁর কার্যকালের মধ্যে তিনি শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম ও ধামের অন্যান্য সব মন্দিরের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ প্রচুর করেছিলেন। নতুন নতুন ভক্তদের নামদানের পূর্ণ অধিকার ঠাকুর তাঁকে দিয়েছিলেন।

📌 হ্যাশট্যাগ:

#কৈবল্যধাম #শ্রীরামঠাকুর #SriSriRamthakur #Kaibalyadham #Ramthakur #SpiritualHistory #BengaliDevotional #RamthakurLeela #কৈবল্যশক্তি #BanglaBhakti

🙏 জয় শ্রীশ্রী রামঠাকুর 🙏

বিস্তারিত আধ্যাত্মিক ইতিহাস ও ভক্তিমূলক কাহিনী — :contentReference[oaicite:0]{index=0}

Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel) on মে ১৩, ২০২৬ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.