১৯২৭ সাল হইতে ঠাকুর চাঁদপুরকে কেন্দ্র করিয়া চতুর্দ্দিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেন, বেশীর ভাগ সময়ই চাঁদপুরে থাকিতেন। চাঁদপুরের অধিকাংশ লোকই প্রত্যহ ঠাকুরের নিকট আসিতেন এবং ঠাকুরের উপদেশ ও গীতার ব্যাখ্যা শুনিয়া নিজেদের ধন্য মনে করিতেন।
ঠাকুর শেষরাত্রি চারিটার সময় শয্যাত্যাগ করিয়া হাত-মুখ ধৌত করিবার পর বিছানার উপরে বসিয়া থাকিতেন। আমার স্ত্রীও ঐ সময় উঠিয়া তাঁহার ভোগের ব্যবস্থা করিতেন। এত ভোরে ঠাকুরের ভোগ হইত যে, বহু দিন আমিও জানিতে পারিতাম না ।
একদিন অনেক রাত্রি পর্য্যন্ত সমবেত লোকদিগের সহিত কথা বলিয়া প্রায় একটার সময় ঠাকুর শয়ন করিলেন। পরদিন অতি প্রত্যূষে আমি ঘুম হইতে উঠিয়া দেখি ঠাকুর যথারীতি বিছানার উপর বসিয়া আছেন ।প্রণাম করিয়া বলিলাম, “রাত্রিতে ঘুম হইয়াছে ত?”
ঠাকুর বলিলেন, “সারারাত খুব কীর্ত্তন হইয়াছে, ঘুমের প্রশ্নই উঠে না—”
আমি অবাক হইয়া বলিলাম, “আমরা ত কিছুই শুনিতে পাই নাই।” ঠাকুর কোন কথাই বলিলেন না। এই রকম প্রায়ই বলিতেন, কীর্তনের জন্য তাঁহার ঘুম হয় না ।
একদিন আমি ঠাকুরকে বলিলাম, “এতগুলি লোক আমরা এই ঘরে থাকি, আপনি যে কীৰ্ত্তনের কথা বলিতেছেন তাহা আমরা একজনও কেন শুনিতে পাই না?”
সেইদিন রাত্রি প্রায় বারোটার সময় ঠাকুরের হাত-পা টিপিয়া মশারি ফেলিয়া দিয়া বাহিরে আসিলাম, মনে হইল ঠাকুর গভীর নিদ্রায় অভিভূত, আমিও শুইয়া পড়িলাম ।
ঠাকুরের বিছানার খুব নিকটেই আমার বিছানা, চুপ করিয়া শুইয়াছিলাম, ঘুম আসিতেছিল না, হঠাৎ শুনিলাম একটি কীর্তনের দল কীর্ত্তন করিতে করিতে এই দিকে আসিতেছে। খোল, করতাল, সিঙ্গা ও কাঁসরের শব্দ মিলিয়া যেন একটা ওঙ্কার ধ্বনি উঠিতেছে। মনে হইল, কীর্তনের দলটি আমাদের বাড়ীর নিকট আসিয়া পড়িয়াছে, বিছানা হইতে উঠিয়া গিয়া বাহিরের দরজা খুলিয়া দিলাম। কিন্তু তখন আর কীর্তনের শব্দ পাইলাম না, এমন কি রাস্তায় জনপ্রাণীও দেখিলাম না ।
মনের ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয় স্থির করিয়া সদর দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া পুনরায় শয়ন করিলাম। শয়ন করিবামাত্রই আবার কীর্তন, মনে হইতেছে কীৰ্ত্তনদল আমাদের বাড়ীর পশ্চাতের গলি দিয়া আসিতেছে। আবার উঠিয়া গেলাম, এবারেও বিফল মনোরথ হইতে হইল। সেই রাত্রিতে এইভাবে চার পাঁচ বার বাহিরে দৌড়াদৌড়ি করিয়াও কোন কীর্তনের দল দেখিতে পাইলাম না, অবশেষে আর উঠিব না মনে করিয়া শয়ন করিলাম। এবারেও শয়ন করিবামাত্রই কীর্তনের শব্দ শুনিতেছিলাম এবং ঐ সুমধুর কীর্ত্তন শুনিতে শুনিতে কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছি জানিতে পারি নাই ।
পরের দিন সকালে ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “কাল রাত্রিতে কীৰ্ত্তন হইয়াছে কি?” ঠাকুর বলিলেন, “ক্যান্, আপনি শোনেন নাই?” রাত্রির সমস্ত ঘটনা ঠাকুরকে বলাতে বলিলেন, “কীৰ্ত্তন শুনিতে চাইছিলেন না? বড়ই মধুর এই কীর্ত্তন, প্রায় সারারাত্রি ধরিয়া এই কীর্ত্তন রোজই শুনিতে পাই।” আমি বলিলাম, “কাহারা এই কীর্ত্তন করে?” শ্রীশ্রীঠাকুর কোন উত্তর না দিয়া অন্য
প্রসঙ্গ আরম্ভ করিলেন ।----------------- শ্রীগুরু শ্রীশ্রীরাম ঠাকুর (রোহিণী কুমার মজুমদার)
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন
(
Atom
)






.jpg)
কোন মন্তব্য নেই: