ঠাকুর কখনো আমাদের সোজাসুজি ধর্ম্মের তত্ত্বোপদেশ দিতেন না, এইরূপ গল্পের মধ্য দিয়া বুঝাইতেন । তখন গল্প শুনিয়া হাসিতাম, ভাল লাগিত। কিন্তু এখন বুঝিতেছি ঐ গল্পের মধ্য দিয়া তিনি আমাদের বুঝাইয়াছিলেন মায়ার কি অসীম প্রভাব! সহজ গল্পের মধ্য দিয়াই সত্যের কথা বুঝাইতেন। তিনি তখন নানা রকম রান্না বান্নার কথাও বলিতেন, বাচ্চাদের লইয়া খেলা করিতেন। ঠাকুরের আসারও কোন ঠিক ছিল না, খবরও দিতেন না । কখনও কখনও ২/৪ দিন পরেই হয়ত আসিতেন। আবার হয়ত একদিন থাকিয়াই চলিয়া যাইতেন। আমরা থাকিতে বা যাইতে বলিতাম না। নিজের ইচ্ছামতই চলিতেন।
একবার তিনি যখন আসেন, আমরা তিন জা ও বসন্তবাবুর স্ত্রী ঠিক করিলাম- এবারে ঠাকুর আছেন, আমরা শিব চতুর্দশীর উপবাস করিব। ইহার পূর্ব্বে আমরা কেহই ঐরূপ উপবাস করি নাই। আমরা স্নান সারিয়া ঠাকুরের কাছে আসিয়া বসিলাম। ঠাকুর বলিলেন, “খাইয়াছেন কি?” আমরা মুচকি মুচকি হাসিতেছিলাম। কে একজন বলিলেন, *আজ তো শিবচতুর্দশীর উপবাস।” ঠাকুর বলিলেন, “ও, উপবাস করিয়াছেন বুঝি! শিবচতুর্দশীর দিন উপবাস করা ভাল, খুব ভাল।” কয়েকবারই এই কথা বলিলেন, তখন আমার কোন একটি মেয়ে কোলের ছিল। তাহাকে দেখাইয়া ঠাকুর বলিলেন, “পিতাইন্যা দুধ খাইয়া তো এর অসুখ করিবে। আপনি একটু মাছের ঝোল ভাত খাইয়া আসেন।” অনেক লুচি টুচি ভাজাও ছিল। অন্যদের তিনজনকে বলিলেন, “ঐখানে গিয়া দেখেন, কি কি আছে। গিয়া খান। পর্দাটা ফেলিয়া দিন, কেহ দেখিবে না ।”
আমি গিয়া ভাত খাইলাম। এঁরা লুচি মণ্ডা খাইলেন । ঠাকুর আমাদের এই উপবাস করাইলেন! আর সেদিন বৈকাল হইতে রাত পর্যন্ত যত সব লোক আসিলেন সবাইকে বলিলেন, “আজ আমার মায়েরা উপবাস করিয়াছেন।” যতজন আসিলেন প্রথম খবরই হইল, “মায়েরা আজ উপবাস করিয়াছেন।” কে একজন বলিলেন, “উপবাস তো সবাই করে। আমরাও তো করিয়াছি।” বলিলেন, “না আমার মায়েরা করিয়াছেন।” পরে এঁরা (শুভময় দত্ত মহাশয় ও অন্যরা) আমাদের কি ধরণের উপবাস হইয়াছে জানিয়া খুব হাসিয়াছিলেন ।
পরের দিন কামিনী বাড়ূয্যার বাসায় ইনি ( রায় বাহাদুর শুভময় দত্ত) ও আমার ভাসুর ঠাকুরকে গাড়ী করিয়া দিয়া আসিলেন। সেদিন খুব বৃষ্টি ছিল । এঁরা স্নান করিয়া খাইতে যাইবেন, কি বসিয়াছেন- এমন সময় ঐ বৃষ্টির মধ্যে ঠাকুর হাঁটিয়া বাড়ী আসিয়া পৌছিলেন। পিছনে পিছনে কামিনীবাবু ছুটিতে ছুটিতে আসিতেছিলেন। তিনি বলিলেন, “ঠাকুর সেখানে যাইয়াই বলিলেন- “আমি যাই, মায়েরা কাল উপবাস করিয়াছেন। আমি না গেলে তাঁরা “পান্না” (পারণ্য) করিবেন না।” মায়েরা কি উপবাসই করিয়াছেন!- চারিদিকে হাসাহাসি পড়িয়া গেল । এঁরা তাড়াতাড়ি উঠিয়া গেলেন। ঠাকুর ততক্ষণে ঠাকুরঘরে জোড়াসন করিয়া বসিয়াছেন ।
বসন্তবাবুর বোন বিধবা হওয়ার পর অন্ন গ্রহণ করিতেন না। তিনি বিধবা হওয়ার পরই কাশী এবং সেখানেই থাকিতেন। এই সময়ে তিনি দ্বিপ্রহরে ঠাকুরের কাছে আসিতেন, ঠাকুরের সাথে বহু কথা বলিতেন। সেদিন খানিকটা দেরীতে আসিয়াছিলেন। ঠাকুর জিজ্ঞাসা করিলেন,- আপনার এত দেরী হইল কেন?” তিনি বলিলেন, 'আপন কি জানেন না গতকাল শিব চতুদশী ছিল। আজ পান্না করিয়া ভোজন করাইলাম। কাজেই খাওয়া দাওয়া সারিয়া আসিতে হইল।” ঠাকুর বলিলেন,- "কাল বুঝি শিব চতুর্দশী ছিল? কৈলাসের কতদূর গেলেন? শিব দুর্গার সঙ্গে দেখা হইয়াছিল?
কি বলিলেন? কিছু বলিলেন, টলিলেন কি?" তিনি চুপ করিয়া রহিলেন। আমরাও মুখের দিকে চাহিয়া রহিলাম। তখন ঠাকুর বলিলেন, "ঊপ” হইল নিকটে, 'বাস' হইল থাকা। ভগবানের কাছে থাকাই "উপবাস। না খাইয়া আত্মা, যিনি ভগবান তাঁহাকে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। নাম, করিলেই ভগবানের কাছে থাকা হয়। ভগবানই 'নাম', নামই ভগবান।” ইহার পর হইতে নোয়াখালীর অনেকের মধ্যেই উপবাসে গোঁড়ামী উঠিয়া গিয়াছিল। অনুষ্ঠান, পূজা, আরতি সবই হয়। তবে না খাইয়া থাকার জন্য কোন ধরা বাঁধা কিছু ছিল না।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন
(
Atom
)






.jpg)
কোন মন্তব্য নেই: