শ্রীশ্রী রামঠাকুরের জীবন ও উপদেশ | পরিশিষ্ট সম্পূর্ণ পাঠ | গভীর আধ্যাত্মিক বাণী Alternative Titles: ঠাকুরের কথা| শ্রীশ্রী রামঠাকুরের জীবন দর্শন Sri Sri Ramthakur Life & Teachings | Bengali Spiritual Reading ঠাকুরের আধ্যাত্মিক জীবন রহস্য | পূর্ণ পাঠ ও ব্যাখ্যা
“ভারতের সাধনা” নামক মাসিক পত্রিকার অনেক বৎসর পূর্বে অন্তর্গত “ঠাকুরের কথা” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ আমাদের শ্রদ্ধেয় গুরুজন প্রভাত চন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয় প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাহাতে ঠাকুরের আধ্যাত্মিক জীবনের কতক পরিচয় পাওয়া যাইবে মনে করিয়া পাঠকদের কৌতূহল চরিতার্থের নিমিত্ত এখানে লিপিবদ্ধ করা হইল।
১।
আজ ঠাকুর কথা বলিতে যাইতেছি, দুঃখের বিষয়, ঠাকুর কথা বুঝি নাই—বুঝিবার মত সামর্থ্যও নাই। সে মানুষটিকে যেমন সহজে ধরা যায় না, ঠাকুর মুখের কথাও তেমনি সহজে বুঝা যায় না। আমরা না বুঝিয়াছি সে মানুষটিকে, না বুঝিয়াছি ঠাকুর কথা। যে সাধনা ও একাগ্রতা থাকিলে ঠাকুর কথার নিগূঢ় তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করা যায়—ঠাকুর তত্ত্ব মনের সামনে ফুটিয়া তুলিতে পারা যায়—ঠাকুর যে আমাদের নিকটই আছেন—ইহার বাস্তবতা সম্বন্ধে জীবনে রহস্যময় এবং সাধারণ বুদ্ধির অগম্য, ঠাকুর কথার মধ্যেও যে আমাদের না বুঝিবার মত অনেক কিছু থাকিবে তাহাতে আর আশ্চর্য কি! আশ্চর্য হয়, ঠাকুর কথা বলিতে গিয়া বোধ হয়, অজ্ঞানতাবশতঃ নিজের আমাদের কথাই বলিয়া বসি। বুঝা না বুঝা লইয়াই বা এত কেন? তিনিই বলিতেন, একেবারে কিছু না বুঝিতে পারাই সর্ব্বোৎকৃষ্ট বুঝা। অজ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান।
২।
আমাদের বাংলাদেশের কোন একখানি অজ্ঞাত গ্রামে তিনি একদিন জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। বোধ হয় সেই দিনটি শুভ দিনই হইবে। ঠাকুর জনক-জননী উভয়ই বড় ভাল মানুষ ছিলেন। আচরণ, নীতি ও ধর্মপরায়ণতার সাক্ষাৎ দেব-দেবীর মত। পিতা-মাতা ভাল না হইলে ঠাকুরের সন্তান এমন হইবে কেন? তিনি বিশেষ শিক্ষালাভ হয়তই একটু কম প্রকৃতির ছিলেন। ভবিষ্যৎ জীবনে যাহা হইয়াছিল, তাহার সূচনা ছোট বেলায় খেলা-ধুলার মধ্যেই বেশ ফুটিয়া উঠিয়াছিল। লেখাপড়ার জন্য পিতা-মাতার যে কষ্ট সহ্য করিয়াছিলেন জানি না, তবে বালকের তেমন আগ্রহ ছিল না, এই ধরণ সত্য। লোকে বলে যে, কৈশোরে পণ্ডিতত্বের সময়ই নাকি তাহার বোধের উদয় হইয়াছিল এবং সেই সঙ্গে পাণ্ডিত্যের অন্ত হইয়াছিল। ভাবনায় ও সাধনায় দৈহিক ব্যাপারে তাহার বরাবরই যথেষ্ট উদাসীনতা ছিল, কিন্তু খেলাধুলায় মনোযোগের বিশেষ অভাব ছিল বলিয়া মনে হয় না।
৩।
ভাবের শিশুকাল স্বভাবের কোলেই বর্ধিত হইতে লাগিল। জীবনের পথ দর্শনের জন্য কাহারও অপেক্ষা ছিল না। স্বভাবে অবস্থান করিয়া তিনি এমন কিছু লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন, যাহার দ্বারা কখনই তাহার ভাব স্বভাবের প্রকৃতি ঘটিতে পারে নাই। শত সহস্র ভাবের মধ্যে পড়িয়াও স্বভাবকে আঁকড়াইয়া থাকিতেন, ইহাই তাহার জীবনের মূলমন্ত্র। অবিচলিতভাবে ভাবের বেগ সবসময়ই ছিল তাহার সাধনার প্রধান। প্রকৃতি নির্ভর গড়া-কাঁচা জীবনের মধ্যে স্থির থাকা সহজ কথা নয়। সুখ-দুঃখাদির দ্বন্দ্বের মধ্যে যিনি নিরপেক্ষভাবে দাঁড়াইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই প্রকৃত যোগী—তিনিই প্রকৃত সিদ্ধ।
৪।
বালক ক্রমে ক্রমে যৌবন সীমায় পদার্পণ করিল। আপনাআপনি তাহার যোগাভ্যাস হইতে লাগিল। তারপর একদিন গুরুদেব আসিয়া উপস্থিত—দেবতুল্য কলেবরের মহাপুরুষ। একদিকে চিরায়ত রাজার বিরাট পুরুষ, অপরদিকে স্বভাবসিদ্ধ তরুণ শিষ্য। উভয়ের মিলনে অদ্ভুত প্রীতির সঞ্চার হইল—আনন্দের পূর্ণ মন্দাকিনী প্রবাহিত হইল। জন্মজীবন সংস্কারবলে তাহার দিব্যজ্ঞানলাভ হইতে বিলম্ব হইল না। জন্মজন্মান্তরের ন্যায় তখন তাহার পূর্ব জন্মান্তরের স্মরণ হইতে লাগিল। সদগুরুর কৃপা হইলে এইরূপই হইয়া থাকে।
৫।
স্বল্পযোগে একদিন সিদ্ধিলাভ হইল। ইহার পর হইতে তীব্র তপস্যার আরম্ভ। আজও বুঝি সে তপস্যার অবসান হয় নাই। কঠোর সাধনা না করিলে পরমার্থ লাভ হইবে কেন? তারপর দীর্ঘকালব্যাপী সাধনায় নিমগ্ন থাকিলেন। পর্বতে-পর্বতে, অরণ্যে-অরণ্যে বহু বহু পথ অতিক্রম করিলেন। অনেক দুঃখ ও ত্যাগ সহ্য করিলেন এবং খাঁটি লোকাচার অন্তরালে থাকিয়া জীবন যাপন করিয়াছেন, এই প্রকার বহু মহাত্মার সাক্ষাৎকার লাভ হইল। ইহার সাধনায় সিদ্ধিলাভ হইল। কামনা বাসনাগুলি পুড়িয়া ছাই হইয়া গেল। এখন হইতে অধিকাংশ সময়ই অপ্রকাশ অবস্থায় বাস করিতে লাগিলেন—ইহাই বাকি জীবনের অবস্থা।
৬।
শরীর এবং মনের এখন ভিন্ন অবস্থা। বাল্য ও যৌবনকে দূরে ফেলিয়া তিনি এখন বার্ধক্যের দশায় আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। কিন্তু শৈশব অগত হয় নাই—বাল্যভাব একেবারে দূর হয় নাই এবং বালকচিত্ত মাধুর্যের ভাব লোপ পায় নাই, বরং পাকিয়া আরও রসময় হইয়াছে। মূর্তিতেও পূর্বের ন্যায় তেমনি সুন্দর, তেমনি মধুর, তেমনি চিন্তাকর্ষক বলিয়া আজও প্রতীয়মান হয়। ভাবের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটে নাই। পূর্বে যেমন ছিলেন আজও ঠিক তেমনি আছেন।
৭।
এখন জীব হইয়াছেন। জীবের দুঃখ মলিন দেখিয়া, ভগবৎ বিরহ দেখিয়া, তাহার করুণাময় হৃদয় বড়ই ব্যথিত। কিসে জীবদুঃখের মূল উৎপাটন করা যায়—অন্তরের বন্ধন উন্মোচন করিয়া শুদ্ধ সত্যকে লাভ করিয়া জীবন পরমার্থ বা পরিত্রাণ লাভ করিবে—ইহাই এখন ভাবিবার বিষয়। তিনি বলেন, মিথ্যার আবরনে শুদ্ধ সত্য অবস্থিত রহিয়াছে—ঘন নিবিড় মেঘজালে সূর্যকান্ত আচ্ছাদিত থাকেন; মায়ার ইন্দ্রজাল ছিন্ন করিয়া শুদ্ধ সত্যকে উদ্ধার করাই ধর্ম।
৮।
তাহার উপদেশ বাণী অতিশয় গভীরার্থবহ। এই উপদেশের সহিত ভারতের চিরায়ত শাস্ত্রবাক্য বা ঋষিবাক্যের কোন বিরোধ নাই। বরং প্রতি পদে বিশেষ সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়। উপনিষদ, গীতার উদাত্ত গম্ভীর উপদেশের সারাংশ তিনি সহজ ভাষায় ও অল্প কথায় বলিয়া থাকেন।
৯।
নিজে শান্ত না হইলে শান্তি পাওয়া যায় না। মানুষ শান্তি খুঁজিয়া বেড়ায়, কি কি কৌশলে যে তাহাকে লাভ করিতে হয় তাহা জানে না। ভাল-মন্দ, জয়-পরাজয় লইয়া থাকিলে কামনা-বাসনা দূর হয় না এবং চিত্তের উদ্বেগ ও দুঃখ অপসারিত হয় না।
১০।
আপনার উপর কতই আরোপ করিয়াই মানুষ যত প্রকার দুঃখের সৃষ্টি করে। স্বল্প অর্থ হইয়াও কতই ব্যথা অতিশয় সে অসংখ্য কষ্ট ভোগ করিয়া থাকে। আত্মার কোন ক্ষতি বা ভোগ নাই। গীতায় বলা হইয়াছে—“অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে”।
১১।
যাহা সহজে ত্যাগ করা যায় কিংবা যাহা উদয় হইতেই অন্তর্হিত হয়, সেগুলিকে ছাড়িয়াই আত্মস্থ বা স্থিরপ্রজ্ঞ হওয়া আবশ্যক। অভাব আপনিই দূরে সরিয়া যায়। তাহাকে দূর করিবার জন্য আর চেষ্টা করিতে হয় না।
১২।
তাহার সহিত যে কি সম্বন্ধ তাহা জানি না। জানিবার প্রয়োজনও হয় নাই। তবে সত্য কথা এই যে, তাহাকে বড় ভাল লাগে—প্রাণ ভরিয়া ভালবাসিতে ইচ্ছা হয়। তাহার স্বভাব-সুন্দর মূর্তি, বালকসুলভ ও প্রাণস্পর্শী মধুর কথা সকলের প্রাণে আনন্দধারা বর্ষণ করে।
— শ্রীপ্রভাত চন্দ্র চক্রবর্তী
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
March 26, 2026
Rating:





.jpg)
No comments: