শ্রীশ্রী রামঠাকুরের বলা গল্প শুনি
সত্যের বলের শক্তি
সে অনেক অনেক বছর আগের কথা। তখন না ছিল রেলগাড়ি, না ছিল স্টিমার বা মোটরগাড়ি। মানুষ হেঁটেই দূরের তীর্থ বা অন্য কোথাও যেতেন। খুব ভোরে বেরিয়ে, আর ভোরের দিকেই কোন গৃহস্থের বাড়ি বা কোন রাজা বা জমিদারের বাড়িতে রাত্রে বিশ্রাম নিতেন। এই সমস্ত পথ চলা মানুষকে বলা হয় পথিক। পথিক মানুষকে গৃহস্থ বা রাজবাড়িতে বলে দেওয়া হতো অতিথিকে দেবতার মতো মান্য করা, তার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা সমাজের নীতি ও পুণ্যের কাজ।
সেই সময় এক রাজার রাজ্যে খুব সৎ এক চর্মকার থাকতেন। সেই চর্মকার সারা দিন দু জোড়া মানে মোট চারটে জুতো খুব ভালোভাবে বানাতেন। বাজারে নিয়ে যেতে না যেতেই তার সেই জুতো বিক্রি হয়ে যেত। দু জোড়া জুতো বিক্রি করে যে সামান্য কটা টাকা লাভ হতো সেই টাকায় খাবার কিনে বাড়ি ফিরতেন। মনের আনন্দেই সেই কেনা খাবার খেতেন। খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে পরের দিনের কাজের জন্য সেই চর্মকার বড় এক গামলায় জলে চামড়া ভিজিয়ে রাখতেন।
— এই ছিল তার প্রত্যেক দিনের কাজ। তিনি মিথ্যা কথা বলতেন না। তার কোন লোভ ছিল না। সংযমের সাথে কাজ করে শান্তিতে দিন কাটাতেন। টাকার অভাবে কোন তীর্থ বা গঙ্গার স্নানেও যাওয়া হতো না। তা বলে, তার মনে কোন দুঃখ ছিল না। এমন কি কোন মনোকষ্ট এলে তিনি চামড়া ভেজানো জল ভিজিয়ে “গঙ্গা, গঙ্গা, গঙ্গা” বলে তিন বার মাথায় ছুঁইয়ে নিতেন। তাতেই তিনি গঙ্গা স্নানের তৃপ্তি ও শান্তি পেতেন।
সেইদিন স্নান যাত্রা, বিশেষ স্নানযোগ। দুপুরের দারুণ গরমে এক ব্রাহ্মণ পথিক চলেছেন গঙ্গা স্নানে। পথ চলতে চলতে ক্লান্ত ব্রাহ্মণ বিশ্রাম নিতে গেলেন ঐ চর্মকারের কুটিরে। চর্মকার অতিথি ব্রাহ্মণকে আদরে ঘরে এনে বসালেন। গাছের থেকে তাজা ফল পেড়ে এনে খাওয়ালেন। পাখা দিয়ে বাতাস করে তার ক্লান্তি দূর করে দিলেন।
কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর ব্রাহ্মণ বেরিয়ে পড়ার পালা। চর্মকার তখন পাঁচটা হরিতকী ফল ব্রাহ্মণের হাতে দিয়ে বললেন—
“মা গঙ্গা সর্বজ্ঞ জানেন, আমার তো গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়ার মতো ক্ষমতা নেই, আপনি দয়া করে আমার হয়ে এই পাঁচটি হরিতকী ফল মা গঙ্গাকে দেবেন। ‘গঙ্গা’ তাই হবে,” বলে ব্রাহ্মণ চর্মকারের দেওয়া পাঁচটি হরিতকী ফল চাদরে বেঁধে বেরিয়ে পড়লেন।
গঙ্গার পাড়ে বিরাট মেলা বসেছে, লোকের ভিড়। ঘাটেও বেশ ভিড়। তার মাঝে ব্রাহ্মণ গঙ্গা স্নান করলেন। অনেকক্ষণ স্তব স্তোত্র পাঠ করলেন। কেবল ভুলে গেলেন চর্মকারের দেওয়া পাঁচটি হরিতকী ফল মা গঙ্গাকে দিতে।
এবার ফেরার পালা। ব্রাহ্মণ চলেছেন মেঠো পথ ধরে। বেশ কিছুটা আসার পর হঠাৎ তার চোখে পড়লো চাদরের খোঁচায় বাঁধা হরিতকী ফল। মনে পড়ে গেল চর্মকারের কথা, তার অনুরোধ। ব্রাহ্মণ গঙ্গার দিকে আর ফিরে না গিয়ে হরিতকী পাঁচটা পথের ধারে এক ডোবায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।
অবাক কাণ্ড! দেখেন ডোবার সুন্দর জল থেকে মুড়ি করে বেরিয়ে এলো সুন্দর কাঁকন পরা এক জোড়া হাত। পদ্মফুলের পাপড়ির মতো সুন্দর হাত হরিতকী ফল পাঁচটা নিয়ে এ ডোবার জলে ডুবে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে ব্রাহ্মণ মনে মনে ভাবলেন, এত সুন্দর হাত কখনও মানুষের হতে পারে না। এই হাত নিশ্চয় মা গঙ্গারই হাত।
বাড়ির পথে কিছুটা চলার পর হঠাৎ তার মনে ভাবনা এলো— আমি সমগ্র জীবন কত গঙ্গা স্নান করলাম, কত স্তব পাঠ করলাম তবু ভাল ফল মা গঙ্গাকে দিলাম, কোন দিন তো মা গঙ্গার হাত দেখিনি। চর্মকার কোন বিশেষ কোন মন্ত্র পাঠ করে, হরিতকী পাঁচটা আমাকে দিয়েছিল। তার কাছ থেকে এই মন্ত্র আমাকেও জানতে হবে।
ব্রাহ্মণ নিজের বাড়ির দিকে না গিয়ে এলেন চর্মকারের বাড়িতে। চর্মকার ব্রাহ্মণকে ফিরতে আসতে দেখে অবাক! তাকে ঘরে এনে বসালেন। সমস্ত ঘটনা শুনে ব্রাহ্মণ চর্মকারকে জিজ্ঞেস করলেন—
“আচ্ছা! কি মন্ত্র পাঠ করে তুমি হরিতকী ফল পাঁচটা আমাকে দিয়েছিলে?”
চর্মকার বললেন—
“ব্রাহ্মণ ঠাকুর! মন্ত্র, তন্ত্র আমি কিছুই জানি না। যা জেনেছি তা মেনে চলেছি। জীবনে কোন দিন মিথ্যা কথা বলিনি। মিথ্যা ব্যবহার করিনি। কাউকে ঠকাইনি। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি ভগবান সমস্ত জায়গায় সমান ভাবে আছেন।”
এই বলে চর্মকার থামলেন। জল এনে ব্রাহ্মণের পা ধুইয়ে দিলেন। এবার চর্মকার হাতজোড় করে ব্রাহ্মণকে বললেন—
“আপনি সমস্ত দিন কিছু খাননি, না খেয়ে যেতে পারবেন না। এই আমার অনুরোধ।”
ব্রাহ্মণ আর আপত্তি না করে চর্মকারের বাড়িতে রাত্রি করে খেয়ে নিলেন। রীতি অনুসারে ভোজনের পর ব্রাহ্মণকে ভোজন দক্ষিণা দিতে হয়। ব্রাহ্মণকে চর্মকার বললেন—
“আমার মা গঙ্গা! দেওয়ার মতো কিছু নেই। আপনাকে কি দিয়ে দক্ষিণা দেব?”
ভাবতে ভাবতে চর্মকার, সোনার কাঁকনটা খুলে এনে ব্রাহ্মণের হাতে দিয়ে বললেন—
“এই কাঁকনখানা মা জননীকে দিও।”
কাঁকন দেখে ব্রাহ্মণ চিৎকার করে বলে উঠলেন—
“এই কাঁকনই তো আমি গঙ্গার জলে মা গঙ্গার হাতে দেখেছিলাম।”
এবার ব্রাহ্মণ খুশি হয়ে চর্মকারকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন—
“ভাই! তুমিই আসল ব্রাহ্মণ, আমি ব্রাহ্মণ নই।”
এই বলে ব্রাহ্মণ চর্মকারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন।
যেতে যেতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। বাধ্য হয়ে রাজার অতিথিশালায় সেই রাতের মতো থেকে গেলেন ব্রাহ্মণ। এদিকে রাজবাড়িতে আরেক ঘটনা। গত রাতে রাণীর হাতের সোনার কাঁকন চুরি গেছে। চোর ধরতে রাজার সিপাহীরা নানা দিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।
পরদিন ভোরে ব্রাহ্মণ বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু সেই কাঁকন কোথাও পাওয়া গেল না। সবাই সন্দেহ করতে লাগলো— রাত্রে যে লোকটা অতিথিশালায় ছিল সেই রাণীর কাঁকন চুরি করেছে। রাজার সিপাহীরা ছুটে গিয়ে ব্রাহ্মণকে ধরে নিয়ে এল রাজার কাছে।
ব্রাহ্মণের পুঁটলি খুলে দেখা গেল একটি সোনার কাঁকন। রাজা কাঁকন নিয়ে চললেন রাণীর কাছে। রাণী দেখেই রাজাকে বললেন—
“এই কাঁকন আমার নয়, তবে এটা সুন্দর কাঁকন।”
রাণী বারবার ধরলেন—
“আমাকে এরকম কাঁকন বানিয়ে দিতে হবে।”
বাধ্য হয়ে রাজা এসে ব্রাহ্মণের কাছে আর একটা কাঁকন চাইলেন। রাজার কথা শুনে ব্রাহ্মণ বললেন—
“মহারাজ! এক চর্মকার আমাকে এই একখানা কাঁকনই দক্ষিণা দিয়েছে। আমার কাছে আর কোন কাঁকন নেই।”
রাজা বিশ্বাস করলেন না। রাজা বললেন—
“শোন ব্রাহ্মণ! এক রাত সময় দিলাম। এর মধ্যে যদি আর একটা কাঁকন না পাই তবে তোমার গর্দান যাবে।”
ব্রাহ্মণ হাতজোড় করে বললেন—
“মহারাজ! আমার কথায় আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না? আমার সাথে লোক দিন, আমি তাকে সেই চর্মকারের কাছে নিয়ে যাব। সেখানে গিয়ে প্রমাণ করে দেব আমি মিথ্যে বলিনি।”
রাজা লোক পাঠালেন। তারা সবাই মিলে চর্মকারের বাড়িতে এলেন। চর্মকার সব শুনে বললেন—
“আমি বেঁচে থাকতে কিছুতেই ব্রাহ্মণ বধ হতে দেব না।”
এই বলে তিনি বললেন—
“মা গঙ্গা! মা গঙ্গা! মা গঙ্গা!”
বলে চামড়া ভেজানো জলে মাথায় ছিটিয়ে নিলেন। তারপর গামলার জলে হাত দিতেই আর একখানা কাঁকন তার হাতে উঠে এল।
হাতে উঠে এল কাঁকনটা। রাজার লোকের হাতে দিতেই তারা ব্রাহ্মণকে ছেড়ে দিয়ে রাজার কাছে চলে গেল।
ব্রাহ্মণ তখন চর্মকারের পায়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
“তুমি আমার গুরু, তোমার জন্য আমার প্রাণ বাঁচলো।”
sound (1)
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
March 08, 2026
Rating:





.jpg)
No comments: