গুরু ভাই বোনসহ সকল সনাতনী ভাই বোনদের জানাই স্বাগত ,উদ্দেশ্য গুরু দেবের অমৃত বানী সকলের মাঝে প্রচার করা।

শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা

 আমার গৃহে যেদিন প্রথম উৎসব অনুষ্ঠিত হয় সেদিন শ্রীশ্রী ঠাকুর উপস্থিত ছিলেন। কীর্ত্তন আরম্ভ হইয়াছে, পূজার সমস্ত উপকরনও জোগাড় হইয়াছে কিন্তু পুজারী পাওয়া যাইতাছে না। ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করিলাম, "সবই তো ঠিক হয়েছে, পূজা করবে কে?" ঠাকুর বলিলেন, "কেন? আপনে কি পূজা করিতে পারিবেন না?" আমি বলিলাম, "আমি তো ব্রাহ্মন নই, আমার পূজায় ব্রাহ্মন গণ আপত্তি করিবেন, হয়তো তাঁহারা আমার উৎসর্গীকৃত ভোগের প্রসাদ গ্রহণ করিবেন না।" ঠাকুর বলিলেন, "আজ প্রসাদ লইতে যদি কেহ আপত্তি করে, জানিবেন তাহার ভাগ্যে প্রসাদ নাই।" একটু হাসিয়া আবার বলিলেন, "আপনার মন্ত্র জানিবার কোন প্রয়োজন নাই, যেভাবে ভোগ দেন, সেই ভাবেই দিবেন, তার চেয়ে ভালো মন্ত্র আর নাই, পূজায় যাইয়া বসেন, যাহা করিতে হয় আমিই করিব।" পূজা সুষ্ঠু ভাবে সমাধা হইল, কীর্ত্তন প্রায় রাত্রি বারোটা পর্যন্ত চলিয়াছিল। বহু লোকের সমাগম হইয়াছিল, জাতি-ধর্ম্ম-নির্ব্বিশেষে সবাই সানন্দে প্রসাদ গ্রহণ করিয়াছিলেন। সেই দিন হইতে প্রত্যেক বাড়িতে আমিই পূজা করিতাম, আমার অনুপস্থিতিতে ঠাকুরের আশ্রিত অন্য কোন গুরুভ্রাতা পূজা করিতেন।

-- শ্রীগুরু শ্রীশ্রী রামঠাকুর
শ্রীরোহিনী কুমার মজুমদার

কিছু চাইতে নাই, গুরুর দান অযাচিত।
যা দেখা যায় সেটা মিথ্যা, যে দেখে সেও ভুল দেখে।
গুরু যে বীজ দেন সেই বীজের সহিত বাস করিতে হয়। উহার সহিত ঘরকন্না করিতে হয়, উহাকে ভালবাসিতে হয়।
রামঠাকুরের কথা - সাধুদর্শন ও সৎপ্রসঙ্গ ১ খন্ড
মহামহোপাধ্যায় ডক্টর গোপীনাথ কবিরাজ

কোন চিন্তা করিবেন না, সর্ব্বদা ভগবৎ অধীন হইয়া থাকিতে চেষ্টা করিবেন। সংসার মায়াময়, প্রারব্ধ ভোগের অন্ত হইলেই শান্তি হয়। প্রারব্ধ ভোগের জন্য বিচলিত হইতে নাই।
-শ্রীশ্রীরামঠাকুর
বেদবানী ২য় খন্ড(১০৮)
নিরুপায় হইলে উপায় হয়ঃ
মলিন মুখে ঠাকুরমহাশয়ের জনৈক আশ্রিতের সহধর্মিণী কায়ক্লেশে সংসারের সব কাজ সমাধা করে যাচ্ছিলেন। অব্যক্ত বেদনার চিহ্ন তার চোখে-মুখে পরিস্ফুট। কী হয়েছে তার স্বামী জানতে চাহিলেও কিছু না বলেই তিনি সরে গেলেন। পরে অনুসন্ধান করে তার স্বামী জানতে পারলেন তার সহধর্মিণীর একটি পয়োধরের একাংশ স্ফীত হয়ে উঠেছে। বোধ হয় একটি ফোঁড়া উঠছে।অনেকটা জায়গা জুড়ে স্থানটি রক্তিম-আকার ধারণ করেছে। শার্টটি গায়ে দিয়ে তিনি চিকিৎসক আনার জন্য যাচ্ছিলেন। লজ্জাশীলা ভদ্রমহিলা জানালেন, "কাহাকেও তিনি দেখাতে পারবেন না।" "না দেখে কী করে চিকিৎসক ঔষধের ব্যবস্থা করবেন? সেটা কি আঁধারে ঢিল মারা হবে না?" বললেন সেই ভদ্রলোক। "না, তার পক্ষে দেখান সম্ভব নয়, কষ্ট যতই হোক না কেন, " উত্তর দিলেন ভদ্রমহিলা।
বর্ষিয়সী প্রতিবেশিনীরা ভদ্রলোকের সহধর্মিণীকে ডাক্তার দেখাতে সম্মত হওয়ার জন্য বহু অনুরোধ ও উপরোধ করলেন, কিন্তু তিনি কোন রকমেই রাজি হতে পারলেন না। প্রথমে উচ্চারিত "না", এতেই তিনি অনড় রহিলেন। ভদ্রলোক পুনরায় তাকে অনুরোধ করলেন।
তার সহধর্মিণী উত্তরে বললেন, ব্যথা যখন বেশী বোধ করেন তখন ঠাকুরমহাশয়ের পটের সামনে দাঁড়িয়ে বেদনার ভার লঘু করার জন্য তাঁহার কাছে কাতরভাবে প্রার্থনা করেন। ঠাকুরমহাশয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই ভদ্রলোক বললেন, ঠাকুরমহাশয় রোগে চিকিৎসা করাতে কাহাকেও নিষেধ করেছেন বলে তো শুনিনি। তবে চিকিৎসক আনতে কেন তিনি বারংবার বাধা দিচ্ছেন। আর, ঠাকুরমহাশয় প্রার্থনা করতে নিষেধ করেছেন। কারণ প্রার্থনা করলেই ঋণ হয়। এই ফোঁড়ার কষ্টটাই তো আর শেষ নয়, তার আরও ফোঁড়া হতে পারে। পরিবারের অন্য সকলেরও অসুখ বিসুখ যতদিন দেহ আছে অনেকবারই হবে। খালি প্রার্থনা করে ঠাকুরমহাশয়কে কত বিরক্ত করবেন তিনি। প্রার্থনা করতে সহধর্মিণীকে সেজন্য পুনর্বার নিষেধ করলেন। চিকিৎসককে দেখাতে পারবেন না ভদ্রমহিলা, একমাত্র সম্বল ছিল প্রার্থনা করা, তাও স্বামীর কথায় বন্ধ হল। এখন বেদনার দুঃসহ ভার একাকী বহন করেই চলতে হবে। উপায় কী?
সকাল তখন গোটা আটেক, হঠাৎ ঠাকুরমহাশয় এসে উপস্থিত হলেন। আশ্চর্য্য বোধ করলেন ভদ্রলোক। ত্রস্ত হস্তে ঠাকুরমহাশয়ের জন্য বিছানা প্রস্তুত করে দিলেন। ঘরের কোণে জলপূর্ণ একটি কুঁজা ও একটি গ্লাস রাখলেন। একে একে বাড়ির সকলেই তাঁকে প্রণাম করলেন। ভদ্রলোকের সহধর্মিণী প্রণাম করেই চলে গেলেন। পাছে ঠাকুরমহাশয় জিজ্ঞাসা করেন, "মা কেমন আছেন? " রোগের কথা তাঁহাকে জানাতে তো পারবেন না, সেজন্য সাত তাড়াতাড়ি তিনি সরে গেলেন।
কর্মস্থলে যাওয়ার কোন ইচ্ছা সেদিন আর ভদ্রলোকের ছিল না। ঠাকুরমহাশয় এসেছেন, তাঁহার সঙ্গলাভ করাই সঙ্গত। কর্ম তো প্রতিদিনই আছে, কিন্তু এই সঙ্গলাভ সুদুর্লভ। ঠাকুরমহাশয় কাজে গাফিলতি একান্তভাবে অপছন্দ করেন। কোন কার্যে ফাঁকি দেওয়া তিনি সমর্থন করতেন না। সেই কারণেই ইচ্ছার বিরুদ্ধেই স্নানাহার সেরে একখানা পঞ্জিকা ঠাকুরমহাশয়ের খাটের উপর রেখে কর্মস্থলে গেলেন তিনি। কিছুক্ষণ পরে ছেলেরা যে যার বিদ্যালয়ে চলে গেল।
বাড়িটা ক্রমশঃ নিস্তব্ধ হয়ে এল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রমহিলার বেদনাও বৃদ্ধি পেতে লাগল। এতক্ষণ কর্মে ব্যস্ত থাকার জন্য বেদনার ভার এত দুর্ভর বলে তিনি বোধ করেননি। এখন বেদনা বড় বেশি বোধ করছেন। মেঝেতে একটি মাদুর বিছিয়ে তিনি শুয়ে পড়লেন। দু'চোখ বেয়ে তার জল ঝরছে। কষ্টে কাতর হয়ে মাদুর শয্যায় তিনি ছটফট করছেন। ফোঁড়ার মধ্যে মাঝে মাঝে যেন কামড় দিচ্ছে। তিনি কাতরাচ্ছেন আর কাঁদছেন। অসহ্য ব্যথায় এখন তার চিকিৎসককেও দেখাতেও আপত্তি নেই। কিন্তু এখন তো বাড়িতে আর কোন ব্যক্তি নেই যে চিকিৎসককে ডেকে আনবে। ওরা ফিরতে ফিরতে সেই বিকাল হবে। এতক্ষণ এই অসহ্য যন্ত্রণা কী করে তিনি সহ্য করবেন।
একটানা একটা করুন কান্নার স্বর ঠাকুরমহাশয়ের কানে আসছিল। পঞ্জিকায় দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তখন তাঁহার। হঠাৎ একটা চিৎকারের শব্দ তাঁর কানে এল।ভদ্রলোকের সহধর্মিণীর ঘরের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ালেন ঠাকুরমহাশয়। ''কী হয়েছে মা?" ঠাকুরমহাশয় জিজ্ঞাসা করলেন। কাঁদতে কাঁদতে ভদ্রমহিলা ফোঁড়া ও তার দুঃসহ যন্ত্রণার কথা তাঁহাকে জানালেন। এখন বাড়িতে কোন পুরুষ নেই, চিকিৎসকও এত বেলায় ডিসপেনসারিতে নেই। সুতরাং চিকিৎসক ডাকবে কে? প্রচন্ড ব্যথায় তিনি কাতর, তাই বললেন, "ঠাকুরমহাশয়, এখন তো আমি নিরুপায়, কী করে এই ব্যথা আর সহ্য করি?" ধীরে ধীরে ঠাকুরমহাশয় তার শয্যার পাশে এসে সস্নেহে বললেন, ''মা, নিরুপায় হইলে উপায় হয়।"
শিশু যেমন মাতৃস্তন্য পান করে, ঠাকুরমহাশয়ও তেমন কয়েকটি মুহুর্তের জন্য সেই ভদ্রমহিলার স্তন্যপানে রত রহিলেন। প্রচুর পুঁজরক্তসহ ফোঁড়াটি ফেটে গেল। দুঃসহ ব্যথার অবসান হল। এই রোগযন্ত্রণায় বহু দিন ধরেই তাকে প্রায় বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়েছিল। যন্ত্রণার উপশম হওয়ায় ধীরে ধীরে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
ঠাকুরমহাশয় নিজের ঘরে ফিরে এসে পূর্বের মত আবার পঞ্জিকা দেখতে লাগলেন। ছুটির পর ছেলেরা একে একে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরে এল। চাদরখানা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ঠাকুরমহাশয়ের বেরিয়ে পড়লেন। কর্মস্থল থেকে গৃহে ফিরে ভদ্রলোক সব কথা শুনলেন। আশ্চর্য্য হলেন ঠাকুরমহাশয়ের অপার করুণায়।
সন্ধ্যার কিছু পরে ঠাকুরমহাশয় ফিরে এলেন। নিয়ে এলেন কয়েকটা গাছগাছড়া, ভদ্রলোকের হাতে সেগুলি তুলে দিয়ে তিনি বললেন,
"এগুলি কেটে এখন একবার মায়ের ক্ষতস্থানে প্রলেপ দিন। আর একবার দেবেন, মা যখন রাত্রিতে শয়ন করতে যাবেন। তাহলে সকালে ক্ষত প্রায় শুকিয়ে যাবে।" দরকার হলে আরও দু'একবার প্রলেপ দেওয়ার কথা বললেন ঠাকুরমহাশয়।
তাদের রোগযন্ত্রণা কমাবার জন্য পূঁজরক্তের কাছে আপন মুখ রাখতে এতটুকু দ্বিধা বোধ করেন নি ঠাকুরমহাশয়। ''অপাত্রে এত করুণা কেন তিনি করতে গেলেন?" ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন। "মায়ের কষ্টে কেউ কী চুপ করে থাকতে পারে?" সস্নেহে জানালেন ঠাকুরমহাশয়। ভদ্রলোকের সহধর্মিণীর ক্ষত প্রায় সবটাই শুকিয়েছে জেনে ঠাকুরমহাশয় পরের দিন সকালবেলা সকলের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। তাঁহাকে বিদায় দিতে ভদ্রলোকের প্রাণ চাইছিল না। কিন্তু ঠাকুরমহাশয়কে বেঁধে রাখবেন এমন কণামাত্রও সম্বল তো তার নেই! ঠাকুরমহাশয়ের একস্থানে অবস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী করার অনুরোধ করাও অন্যায়।হয়ত বেদনা-জর্জর আরও কেহ অধীর আগ্রহে তাঁহার করুণা-লাভের অপেক্ষায় পথ চেয়ে রয়েছেন।
জয় রাম। জয় গোবিন্দ।


ঠাকুর অগণিত নরনারীকে "নাম" দিয়া তাহাদের অজ্ঞানান্ধকার দূর করিয়া শান্তিলাভের পথ নির্দ্দেশ করিতেই চেষ্টা করিয়াছেন, কিন্তু কদাপি নিজেকে গুরু মনে করিয়া গুরুর পদমর্যাদা লাভের ইচ্ছা করেন নাই। যাহারা তাঁহার কৃপা লাভ করিয়াছেন তাহাদিগকে শিষ্য নাম অভিহিত করাও তিনি পছন্দ করিতেন না, তাহাদের সহিত শিষ্যবৎ ব্যবহারও করেন নাই।
শ্রী শ্রী রামঠাকুর ভক্তজন সমক্ষে শুধু ধর্ম আলোচনাই করতেন না। সময় সময় তিনি এমন হাস্যরসের অবতারণা করতেন যে সবাই হেসে গড়াগড়ি যেত ।
এক ভক্তের বাড়িতে বসে তিনি বললেন, একবার ট্রেনে করে চলেছেন। গাড়িতে বেশি ভিড় নেই। হঠাৎ এক ভদ্রলোক এসে তাড়া- তাড়ি তাঁর কাছ ঘেঁসে বসলেন। অন্তর্যামী ঠাকুর তাঁর পাশে বসাট। অনুমান করলেন। এক ভক্ত কয়েকদিন আগে একট। মানিব্যাগ কিনে দিয়েছিলেন। ব্যাগটা তাঁর ফতুয়ার মধ্যে ছিল। ভদ্রলোক বার বার পকেটের দিকে তাকাচ্ছেন। ঠাকুর আলগোছে ব্যাগটা একটু উঁচু করে রেখে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
পরের স্টেশনে ভদ্রলোক ব্যস্তভাবে নেমে গেলেন। ট্রেন ছেড়ে দিল ।
রামঠাকুর বলে উঠলেন, 'হ্যাগা আমার মনিব্যাগটা ভদ্রলোক নিয়ে নেমে গেলেন । ওতে গোটা কুড়ি টাকা ছিল।'
একজন বলে উঠলেন, 'তা একটু আগে বললেন না কেন ? ঠিক ধরে ফেলতাম ঐ পকেটমারটাকে।
একটু থেমে ঠাকুর বললেন, 'ছিঃ ছিঃ উনি পকেটমার হতে যাবেন কেন ! ভদ্রলোকের সংসারে বড় টানাটানি চলছিল, দরকার পড়েছিল নিয়ে গেছেন। তাছাড়া উনি যখন আমার পাশে এসে বসলেন তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম ব্যাগটি ওর দরকার। যাকগে ভদ্রলোকের উপকার হল।'
অন্যান্য ভক্তরা তো হেসেই খুন।
শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel) on March 02, 2026 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.