গুরুদর্শন সর্বকালে মহাসত্য
শ্রীশ্রীঠাকুরের পরম ভক্ত ফণীবাবু স্বয়ং ঠাকুরের কাছ থেকে আরাধ্য নাম পাবার কিছুদিন পর এক গভীর রাত্রে হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। ঘরের কোণে রাখা হারিকেন ল্যাম্পের আলো বাড়িয়ে তিনি দেখেন, তাঁর স্ত্রীর গলা থেকে একটি ঘড়ঘড় শব্দ বেরোচ্ছে।
তিনি তৎক্ষণাৎ স্ত্রীর খাটের কাছে গিয়ে জোরে জোরে ডেকে তাঁর ঘুম ভাঙান। ঘুম থেকে উঠে ফণীবাবুর স্ত্রী বললেন— “ঠাকুর আমাকে নাম দিয়ে উপদেশ দিচ্ছিলেন, আর তখন তুমি আমার ঘুম ভাঙিয়ে সব নষ্ট করে দিলে। ঠাকুরও চলে গেলেন।” এই বলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন।
ফণীবাবু সান্ত্বনা দিয়ে বললেন— “তুমি কাঁদছ কেন? ঠাকুর কৃপা করে স্বয়ং এসে তোমাকে নাম দিয়েছেন, এর চেয়ে সৌভাগ্য আর কী হতে পারে? কী নাম দিয়েছেন বলো, আমি কাগজে লিখে রাখি—নইলে ভুলে যেতে পার।”
স্ত্রী নাম বললে ফণীবাবু তা কাগজে লিখে রাখেন এবং মনে মনে স্থির করেন—এই নাম দিয়েই তিনি ঠাকুরকে পরীক্ষা করবেন।
পরীক্ষা ও সংশয়ের নিরসন
কিছুদিন পর একদিন শ্রীশ্রীঠাকুর ফণীবাবুর বাড়িতে এলে, তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ঠাকুরঘরে প্রবেশ করে দরজার খিল এঁটে দেন। ফণীবাবুর স্ত্রী শ্রীপাদপদ্মে প্রণাম করে হাত জোড় করে বললেন— “আমি নাম চাই।”
ঠাকুর তখন নাম উচ্চারণ করতে শুরু করলেন। একই সঙ্গে ফণীবাবুর স্ত্রীও সেই নাম উচ্চারণ করলেন। ফণীবাবু কাগজে লেখা নামের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেন—একই নাম।
নাম দেওয়া শেষ করে ঠাকুর ফণীবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন—
এরপর ঠাকুর আরও বললেন—
গুরুতত্ত্বের মহাবাণী
এই বলে শ্রীশ্রীঠাকুর নীরব হলেন। সেই নীরবতার মধ্যেই যেন গুরুকৃপা, বিশ্বাস ও পরম সত্যের এক অমোঘ বার্তা ছড়িয়ে পড়ল।
সত্যনারায়ণ পূজা ও নিষ্কাম ভজন
কামনা করিয়া যেবা লইবে প্রসাদ ।
তুল্যমূল্য কাম্য সিদ্ধি ঘুচিবে বিবাদ ।।
জয় রাম । জয় গোবিন্দ ।
সুপ্রভাত।
ভোর বেলায় গেলাম কুঞ্জবাবুর গৃহে। ঐসময় ছাড়া ঠাকুরকে একাকী পাওয়া যায় না। ঠাকুর মহাশয়ের কাছে গেলে এত ভোরে আসার কারণ জানতে চাইলেন তিনি।
আমি বললাম—
আপনাকে দুটো প্রশ্ন করার আছে আমার।
স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ঠাকুর সুস্মিত হাসিতে আমার দিকে চেয়ে আছেন। শ্রীচরণে প্রণাম করে প্রথম প্রশ্ন করলাম—
ঠাকুর মহাশয়, এতদিন তো আপনি আমাদের নিষ্কাম ভজনের কথা বলে এসেছেন। কামনা-বাসনা শূন্য হয়ে নিরহঙ্কারী হয়ে নাম সাধন করতে বলছেন। এখন বলছেন সত্যনারায়ণ করতে, তাঁর কাছে কামনা-বাসনা জানাতে।
দেখছি, সত্যনারায়ণের পাঁচালী লিখে দিচ্ছেন জনে জনে। তাদের বলছেন সিন্নী দিয়ে পাঁচালী পড়তে।
সত্যনারায়ণ পূজা তো কাম্য-কামনার পূজা। পাঁচালীতে লেখা আছে—
তুল্যমূল্য কাম্য সিদ্ধি ঘুচিবে বিবাদ ।।
কাম্য-কামনার পূজায় তো অহঙ্কার শূন্য হওয়া যায় না। এর কারণ কী, বুঝলাম না। তাছাড়া এতে দুটো দল হয়ে যাবে— এক দল নিষ্কামের পক্ষ নেবে, আরেক দল সকাম পূজায় মেতে উঠবে।
আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন হইল— আপনি এখন যেচে প্রায় ডেকে ডেকে নাম বিতরণ করছেন। সেই নামও দেখছি একই নাম (গো-গ)।
আগে তো এমন দেখিনি। নামপ্রার্থীকে নাম চাইতে হইত। তারপর আপনি নাম দেওয়ার হইলে নাম দিতেন, সে নামও এক হইত না।
ঠাকুর মহাশয়ের উত্তর
“হ, বৃন্দাবনে গিছিলাম। সেখানে গোপাল ভট্ট জিউর সঙ্গে দ্যাখা হইছিল। তিনি আমার হাতে একটা ঝোলা দিয়া কইলেন— মহাপ্রভু এই নামের ঝোলাখানা আমারে দিয়েছিলেন, আমি শেষ করতে পারি নাই। তুমি তো দুয়ারে দুয়ারে নাম দিয়া বেড়াও, এরে খালি কইরা দেও।”
“তাই অখন ডাইক্যা ডাইক্যা নাম দিয়া ঝোলা খালি করতাছি।”
ঠাকুর মহাশয় কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে আবার বলতে থাকেন—
“অন্ন চিন্তা বড় চিন্তা। দেখবেন খাবার সামনে পইড়া থাকব, খাইতে পারব না। দেইখ্যা দেইখ্যা না খাইয়া মরব।”
বিয়াল্লিশের দুর্ভিক্ষের অনেক আগেই শ্রীশ্রী ঠাকুর এই কথা বলেছিলেন। পরে কলিকাতায় দুর্ভিক্ষে যে চেহারা দেখেছিলাম, ঠাকুর মহাশয়ের ঐ কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল।
জয় রাম।
ভাগ্য, কর্ম ও মুক্তির রহস্য
“ভাগ্যং ফলতি সর্ব্বত্র” — বেদবাণীর আলোকে জীবনবোধ
📖 বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড | পত্রাংশ নং–১৪১
— শ্রীশ্রী রামঠাকুর
✨ ভূমিকা
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি হল—
আমি যত চেষ্টা করি, তবু ফল কেন আমার অনুকূলে আসে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা কখনও ভাগ্যকে দোষ দিই, কখনও আবার কর্মকে।
বেদবাণী আমাদের এই দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি দেয়।
শ্রীশ্রী রামঠাকুর অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন—
“ভাগ্যং ফলতি সর্ব্বত্র”
অর্থাৎ সর্বত্র ভাগ্যই ফল দেয়।
এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবন, কর্ম ও মুক্তির গভীর দর্শন।
📜 মূল বাণী
বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড, পত্রাংশ নং–১৪১
“ভাগ্যং ফলতি সর্ব্বত্র।
ভাগ্যফলই ভোগ, এই ভোগদানই মুক্ত।
সত্যনারায়ণের নিকট কর্ত্তৃত্ব রাখিয়া আপনি কর্ত্তব্য কর্ম্ম করিয়া যাইতে থাকুন, তিনিই সকল ব্যবস্থা করিবেন।
প্রারব্ধ ভোগের অন্তকারী সত্যই জানিবেন।
প্রাক্তন ভোগ না গেলে জন্ম-মৃত্যুর হাত হইতে ত্রাণ পায় না।
অতএব শান্তিময় সেই সত্যনারায়ণের অধীন হইতে যত্ন করুন, তিনিই ব্যবস্থা করিবেন।”
🧠 ভাগ্য বলতে কী বোঝায়?
ভাগ্য মানে কেবল আকস্মিক ঘটনা নয়।
ভাগ্য হল—
-
পূর্বজন্ম ও এই জন্মের প্রারব্ধ কর্মের ফল
-
যা সময় এলে ভোগ করতেই হয়
-
যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না
বেদবাণী বলে,
👉 ভাগ্যফলই ভোগ
👉 আর এই ভোগ শেষ হলেই জীবের ঋণ শোধ হয়।
⚖️ কর্ম ও ফলের সম্পর্ক
আমরা প্রায়ই ভাবি—
“আমি এত কর্ম করলাম, তবু ফল পেলাম না!”
বেদবাণীর উত্তর অত্যন্ত বাস্তব ও শান্তিদায়ক—
-
কর্ম করা আমাদের অধিকার
-
ফল দেওয়া আমাদের অধিকার নয়
ফলদাতা কে?
👉 সত্যনারায়ণ
যখন আমরা ফলের উপর অধিকার চাই, তখনই অশান্তি শুরু হয়।
কিন্তু যখন কর্তৃত্ব সত্যের হাতে তুলে দিই, তখন কর্মই হয়ে ওঠে সাধনা।
🌱 ভোগ কেন মুক্তির পথ?
সাধারণভাবে আমরা ভোগকে দুঃখ হিসেবে দেখি।
কিন্তু বেদবাণী সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলে—
👉 ভোগ মানে শাস্তি নয়
👉 ভোগ মানে ঋণ পরিশোধ
যে ঋণ শোধ হয়নি, সে আবার জন্ম নেয়।
এই জন্যই বলা হয়েছে—
“প্রাক্তন ভোগ না গেলে জন্ম-মৃত্যুর হাত হইতে ত্রাণ পায় না।”
অতএব জীবনের কষ্টগুলো আসলে মুক্তির প্রস্তুতি।
🕊️ জীবনের সমাধান কোথায়?
বেদবাণী আমাদের জন্য খুব সহজ একটি পথ নির্দেশ করে—
✔️ ফলের দুশ্চিন্তা ত্যাগ করুন
✔️ কর্তব্যে অবিচল থাকুন
✔️ সব কর্তৃত্ব সত্যনারায়ণের হাতে দিন
✔️ শান্তভাবে প্রারব্ধ ভোগ গ্রহণ করুন
এই অবস্থাই হল—
-
কর্মে শান্তি
-
ভোগে মুক্তি
-
জীবনে স্থিরতা
🌍 আধুনিক জীবনে বেদবাণীর প্রয়োগ
আজকের জীবনে—
-
পরীক্ষার ফল
-
চাকরি ও অর্থ
-
পারিবারিক সম্পর্ক
-
মানসিক চাপ
সব ক্ষেত্রেই এই বাণী সমানভাবে প্রযোজ্য।
👉 আপনি চেষ্টা করবেন
👉 ব্যবস্থা করবেন সত্যনারায়ণ
এই বিশ্বাস মানুষের অন্তরে গভীর শান্তি আনে।
উপসংহার
যে ব্যক্তি বলতে শেখে—
“আমি কর্তা নই, সত্যই কর্তা”
সে কখনও ভেঙে পড়ে না।
আজ যদি জীবনে প্রশ্ন থাকে,
আজ যদি দুঃখ থাকে,
তবে এই বাণী স্মরণ রাখুন—
“ভাগ্যং ফলতি সর্ব্বত্র”
🙏 জয় রাম • জয় গোবিন্দ
📘 বাণীর আলোকে পথ চলা (Banir Aloke Poth Chala) – Sri Sri Ramthakur-er Potransho-er Byakhya
✍️ Subrata Majumder
🔖 Blogger SEO Labels (Tags)
Vedbani, Sri Sri Ramthakur, Karma Destiny, Bhagya Karma, Bengali Spiritual Blog, Vedantic Philosophy, Ramthakur Bani, Spiritual Education, Bangla Spirituality
যদি চান, আমি পরের ধাপে—
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের উপদেশ
-
গৃহী হয়েই সাধনা করো – সংসার ত্যাগ নয়, সংসারের মধ্যেই ঈশ্বরসাধনা করাই শ্রেষ্ঠ।
-
মা–বাবাকে ঈশ্বর জ্ঞান করো – পিতামাতার সেবাই পরম তীর্থ।
-
সত্য বলো, সরল হও – সত্য ও সরলতাই মানুষের আসল অলংকার।
-
সংযমী জীবন যাপন করো – আহার, আচরণ ও চিন্তায় সংযম রাখো।
-
নিয়মিত নামস্মরণ করো – প্রতিদিন ঈশ্বরের নাম জপ করো, তাতেই মন শুদ্ধ হয়।
-
কর্মই সাধনা – কর্তব্যকর্ম নিষ্ঠার সঙ্গে করলে সেটাই ভক্তি।
-
সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও – সব পথেই একই সত্যের সন্ধান।
-
পরের উপকার করো – নিঃস্বার্থ সেবাই ঈশ্বরপ্রাপ্তির সহজ পথ।
-
দেহকে পবিত্র রাখো – দেহ মন্দির, একে অপবিত্র কোরো না।
-
ভরসা রাখো – ঈশ্বরের উপর অটল বিশ্বাস রাখলে জীবনের পথ সহজ হয়।
লছি 🙏
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের উপদেশাবলি (সংক্ষেপে):
-
সংসারে থেকেও সাধনা করো
-
মা–বাবাকে ঈশ্বর জ্ঞান করো
-
সত্য বলো, সরল হও
-
সংযমী জীবন যাপন করো
-
নিয়মিত নামস্মরণ করো
-
কর্মই সাধনা জেনে কর্তব্য করো
-
দেহকে পবিত্র রাখো
-
সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করো
-
মানুষের সেবা করো
-
ঈশ্বরে অটল বিশ্বাস রাখো
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের উপদেশাবলি
-
সংসারে থেকেও সাধনা করো
সংসার ত্যাগ নয়—সংসারের মধ্যেই ঈশ্বরলাভ সম্ভব। -
মা–বাবাই প্রথম গুরু
পিতামাতার সেবা ও ভক্তিই পরম ধর্ম। -
সত্য ও সরলতায় স্থিত হও
সত্য বলো, সহজ জীবন যাপন করো। -
ব্রহ্মচর্য ও সংযম পালন করো
ইন্দ্রিয় সংযমই আধ্যাত্মিক শক্তির মূল। -
নিয়মিত নামস্মরণ করো
প্রতিদিন ঈশ্বরের নাম জপ করো—মন পবিত্র হবে। -
কর্মই সাধনা
নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালন করাই ঈশ্বরসেবা। -
দেহকে পবিত্র রাখো
দেহ মন্দির—মদ, নেশা ও অসৎ অভ্যাস পরিত্যাগ করো। -
সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করো
সব ধর্ম একই সত্যের দিকে নিয়ে যায়। -
সেবা করো, দয়া রাখো
মানুষের সেবাই ঈশ্বরসেবার শ্রেষ্ঠ রূপ। -
বিশ্বাস ও ধৈর্য রাখো
ঈশ্বরের উপর অটল বিশ্বাসেই জীবনের শান্তি।
-
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
January 12, 2026
Rating:








.jpg)
No comments: