বইয়ের নাম
নামের আলোয় জীবন
Preface | ভূমিকা
মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, ততই যেন তার মন অস্থির, ক্লান্ত ও একাকী হয়ে পড়ছে। বাহ্যিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অন্তরের শান্তি আজ দুর্লভ। এই সময়েই প্রয়োজন এমন এক সহজ, গভীর ও চিরন্তন পথ—যে পথ মানুষকে নিজের ভিতরের শক্তির সঙ্গে যুক্ত করে।
শ্রীশ্রী রামঠাকুর তাঁর বাণীতে সেই পথ স্পষ্ট। তিনি কোনো কঠিন সাধনার কথা বলেননি; বলেছেন নাম, ধৈর্য, মানবপ্রেম ও শুদ্ধ জীবনের কথা। নামের আশ্রয়ে থেকে সংসারের মাঝেই যে মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায়—এই বই তারই এক বিনম্র প্রয়াস।
“নামের আলোয় জীবন” গ্রন্থটি কোনো তত্ত্বকথা নয়, বরং জীবনের প্রতিদিনের প্রশ্নের সহজ উত্তর। দুঃখ, ভয়, অস্থিরতা, দায়িত্ব, সম্পর্ক—সবকিছুর মধ্যেই কীভাবে নাম আমাদের পথ দেখায়, তাই এই বইয়ের মূল কথা।
এই গ্রন্থ যদি অন্তত একজন পাঠককেও নিজের ভিতরের আলো খুঁজে পেতে সাহায্য করে—তবেই এর সার্থকতা।
জয়রাম।
📚 Chapter-wise বিস্তারিত কাঠামো
অধ্যায় ১ : নাম—জীবনের মূল আশ্রয়
নাম কী, কেন নামই সার, এবং নামকে জীবনের কেন্দ্রে আনার প্রয়োজনীয়তা।
অধ্যায় ২ : মন, বুদ্ধি ও বাসনার খেলা
মানুষের দুঃখের মূল কোথায়—মনকে বোঝার সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা।
অধ্যায় ৩ : সংসারে থেকেও মুক্তির পথ
গৃহস্থ জীবন বনাম ত্যাগ—রামঠাকুরের বাস্তব দর্শন।
অধ্যায় ৪ : দুঃখ, ভয় ও অনিশ্চয়তার ওষুধ
জীবনের সংকটমুহূর্তে নাম কীভাবে শক্তি দেয়।
অধ্যায় ৫ : বিশ্বাস ও ধৈর্যের সাধনা
তাড়াহুড়োর যুগে ধৈর্য কেন সবচেয়ে বড় সাধনা।
অধ্যায় ৬ : মানবপ্রেমই সত্য সাধনা
জাতি, ধর্ম, মতের ঊর্ধ্বে মানবধর্মের কথা।
অধ্যায় ৭ : আধুনিক জীবনে রামঠাকুরের বাণী
আজকের চাকরি, পরিবার, সমাজ—সবখানে প্রযোজ্য শিক্ষা।
অধ্যায় ৮ : দৈনন্দিন জীবনচর্চার সহজ পথ
কোনো কঠিন নিয়ম নয়—সহজ নামচিন্তা ও অভ্যাস।
অধ্যায় ৯ : বাস্তব জীবনের ছোট গল্প ও উপলব্ধি
বাণী কীভাবে জীবনে কাজ করে—অনুভবের আলোকে।
অধ্যায় ১০ : নামের আলোয় ভবিষ্যৎ পথচলা
শেষ কথা—কীভাবে পাঠক নিজেই পথিক হয়ে উঠবেন।
অধ্যায় ১
নাম—জীবনের মূল আশ্রয়
মানুষ সারাজীবন আশ্রয় খোঁজে—কখনো অর্থে, কখনো সম্পর্কে, কখনো ক্ষমতায়, কখনো জ্ঞানে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, এই সব আশ্রয়ই অনিত্য। একসময় অর্থ ফুরিয়ে যায়, সম্পর্ক বদলে যায়, শক্তি ক্ষয় হয়, জ্ঞানও অহংকারে পরিণত হয়। তখন মানুষ আবার নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে বেড়ায়।
এই চিরন্তন আশ্রয়হীনতার মধ্যেই একমাত্র স্থায়ী আশ্রয়ের কথা বলেছেন
শ্রীশ্রী রামঠাকুর—
নাম।
নাম কী?
নাম কেবল কোনো উচ্চারিত শব্দ নয়। নাম হলো সেই চেতনা, যা মানুষকে নিজের আসল স্বরূপের সঙ্গে যুক্ত করে। নামের মধ্যে আছে স্মরণ, বিশ্বাস ও সমর্পণ—এই তিনের মিলন।
যখন মানুষ নাম করে, তখন সে নিজের সীমাবদ্ধ শক্তির বাইরে একটি বৃহত্তর শক্তির উপর নির্ভর করতে শেখে। এই নির্ভরতা দুর্বলতা নয়; বরং এটাই প্রকৃত শক্তির শুরু।
কেন নামই সার?
জীবনের সমস্ত সমস্যার মূল এক জায়গাতেই—মন।
মন চঞ্চল, ভয়প্রবণ, বাসনাময়। মনকে জোর করে দমন করলে সাময়িক শান্তি আসে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয় না।
নাম মনকে দমন করে না—
নাম মনকে রূপান্তরিত করে।
নাম করলে ধীরে ধীরে—
-
ভয় কমে
-
আশা জাগে
-
ধৈর্য জন্মায়
-
দুঃখ সহ্য করার শক্তি আসে
এই জন্যই বলা হয়েছে—
নামই সার, নামের বাইরে আর কিছু চাওয়ার নেই।
নাম ও জীবনের বাস্তবতা
অনেকেই মনে করেন নাম মানে সংসার ছেড়ে দেওয়া।
কিন্তু নামের শিক্ষা ঠিক তার উল্টো।
নাম শেখায়—
-
সংসারে থেকেও আসক্ত না হতে
-
দায়িত্ব পালন করেও অহংকার না করতে
-
সুখে কৃতজ্ঞ হতে
-
দুঃখে ভেঙে না পড়তে
নাম মানুষকে পালিয়ে যেতে শেখায় না,
নাম মানুষকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখায়।
নাম কেন জীবনের কেন্দ্রে আনতে হবে?
আজকের জীবন অত্যন্ত দ্রুতগতির। চিন্তা বেশি, সময় কম, শান্তি কম। এই পরিস্থিতিতে যদি জীবনের কেন্দ্রে নাম না থাকে, তবে জীবন ভারসাম্য হারায়।
নামকে কেন্দ্রে রাখলে—
-
কাজ হয়, কিন্তু কাজই সব নয়
-
সম্পর্ক থাকে, কিন্তু সম্পর্কেই সব আটকে থাকে না
-
সাফল্য আসে, কিন্তু অহংকার জন্মায় না
নাম জীবনের চাকা ঘোরায়,
কিন্তু নাম নিজে স্থির থাকে।
নাম—ভরসার শেষ ঠিকানা
যখন সব পথ বন্ধ মনে হয়,
যখন মানুষ কিছুই বুঝে উঠতে পারে না,
যখন নিজের উপরও বিশ্বাস হারিয়ে যায়—
ঠিক তখনই নাম মানুষের হাত ধরে।
নাম বলে—
“তুমি একা নও।”
এই বিশ্বাসই জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
অধ্যায়ের সারকথা
নাম কোনো অতিরিক্ত সংযোজন নয়—
নামই জীবনের মূল ভিত্তি।
নাম ছাড়া সাধনা শুষ্ক,
নাম ছাড়া জীবন ভারী।
নামের আশ্রয়ে জীবন হালকা হয়।
জয়রাম।
অধ্যায় ২
মন, বুদ্ধি ও বাসনার খেলা
মানুষ প্রায়ই বলে—
“এই মানুষটা আমাকে কষ্ট দিয়েছে”,
“এই পরিস্থিতিটা আমার জীবন নষ্ট করে দিল”,
“ভাগ্য আমার পক্ষে নয়”।
কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়—
মানুষের দুঃখের মূল বাইরের কোনো ব্যক্তি বা ঘটনা নয়।
দুঃখের আসল কেন্দ্র মানুষের নিজের মন।
এই মনকে না বুঝেই মানুষ সারাজীবন দুঃখের সঙ্গে লড়াই করে যায়।
মন কী?
মন হলো অনুভূতির কেন্দ্র।
যা ভালো লাগলে টানে, যা খারাপ লাগলে ঠেলে দেয়—সেই শক্তির নাম মন।
মন—
-
কখনো চায়
-
কখনো ভয় পায়
-
কখনো কল্পনা করে
-
কখনো অতীত আঁকড়ে ধরে
-
কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্থির হয়
মন কখনো স্থির নয়।
এই চঞ্চলতাই মানুষের দুঃখের প্রথম ধাপ।
বুদ্ধি কী?
বুদ্ধি হলো বিচারশক্তি।
মন যখন কিছু চাইতে চায়, বুদ্ধি তখন বলে—
“এটা ঠিক, না ভুল।”
কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়,
যখন বুদ্ধি মনের দাস হয়ে যায়।
মন যা চায়,
বুদ্ধি তখন তার পক্ষে যুক্তি খুঁজে আনে।
এই অবস্থায় মানুষ জানে সে ভুল করছে,
তবু থামতে পারে না।
বাসনা কোথা থেকে আসে?
বাসনা জন্মায় মন থেকে,
কিন্তু শক্তি পায় বুদ্ধির সমর্থনে।
একটা ছোট ইচ্ছা—
যখন পূরণ না হয়,
তখন মন কষ্ট পায়।
বারবার সেই কষ্ট জমতে জমতে—
রাগ, হিংসা, হতাশা, ঈর্ষা হয়ে ওঠে।
এই বাসনাই মানুষকে দুঃখের চক্রে আটকে রাখে।
মানুষের দুঃখের আসল মূল
মানুষ দুঃখ পায়—
-
কারণ সে চায় কিন্তু পায় না
-
পায় কিন্তু ধরে রাখতে পারে না
-
হারানোর ভয়ে আগেই কষ্ট পায়
এই সব কিছুর কেন্দ্রেই আছে—
মন + বাসনা + আসক্তি।
শ্রীশ্রী রামঠাকুর বলেছেন—
মনকে জোর করে দমন করলে শান্তি আসে না।
মনকে বোঝাতে হয়।
মনকে বোঝানো মানে কী?
মনকে বোঝানো মানে—
-
তাকে শত্রু ভাবা নয়
-
তাকে জয় করার চেষ্টা নয়
-
তাকে সঠিক আশ্রয় দেওয়া
মন যখন কোনো স্থায়ী আশ্রয় পায় না,
তখন সে ইন্দ্রিয়, ভোগ ও কল্পনার দিকে ছুটে যায়।
কিন্তু যখন মন নামের আশ্রয় পায়,
তখন ধীরে ধীরে তার চঞ্চলতা কমে।
নাম ও মনের সম্পর্ক
নাম মনকে দমন করে না,
নাম মনকে শান্ত করে।
নাম—
-
মনের উপর আলো ফেলে
-
বুদ্ধিকে স্বচ্ছ করে
-
বাসনাকে দুর্বল করে
নাম থাকলে মন বুঝতে শেখে—
সব চাওয়া পূরণ হওয়াই সুখ নয়।
সহজ উদাহরণ
একটি শিশু খেলনা চায়।
খেলনা না পেলে সে কাঁদে।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর অন্য খেলনায় মন দিলে—
আগের কষ্ট ভুলে যায়।
ঠিক তেমনই—
মন যখন নামের দিকে ফেরে,
বাসনার কষ্ট আপনা থেকেই হালকা হয়।
অধ্যায়ের সারকথা
মানুষের দুঃখের শিকড় বাইরের জগতে নয়,
ভিতরের মনের অস্থিরতায়।
মনকে শাসন নয়—
মনকে সঠিক আশ্রয় দিতে হয়।
নাম সেই আশ্রয়,
যেখানে মন থামতে শেখে,
বুদ্ধি আলোকিত হয়,
আর বাসনা ধীরে ধীরে শক্তি হারায়।
মন বুঝলে দুঃখ বোঝা যায়।
নামের আশ্রয়ে মন শান্ত হয়।
জয়রাম।
অধ্যায় ৩
সংসারে থেকেও মুক্তির পথ
গৃহস্থ জীবন বনাম ত্যাগ—রামঠাকুরের বাস্তব দর্শন
অনেকেই মনে করেন—
মুক্তি পেতে হলে সংসার ছাড়তেই হবে।
দায়িত্ব, পরিবার, কাজ—এই সবই যেন আধ্যাত্মিক জীবনের বাধা।
কিন্তু এই ধারণাই মানুষের জীবনে এক গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি করে।
একদিকে সংসারের টান, অন্যদিকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা—
এই টানাপোড়েনেই মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এই দ্বন্দ্বের সহজ ও বাস্তব সমাধান দিয়েছেন
শ্রীশ্রী রামঠাকুর।
ত্যাগ মানে কী?
ত্যাগ মানেই কি ঘর ছেড়ে বন-পর্বতে চলে যাওয়া?
ত্যাগ মানেই কি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া?
না।
ত্যাগের আসল অর্থ—আসক্তি ত্যাগ।
সংসার থাকুক,
কিন্তু সংসার যেন মনকে বেঁধে না ফেলে।
গৃহস্থ জীবন—বন্ধন না সাধনার ক্ষেত্র?
সংসার আসলে একটি বিদ্যালয়।
এখানেই—
-
ধৈর্য শেখা যায়
-
দায়িত্ববোধ তৈরি হয়
-
ভালোবাসা ও সহানুভূতি জন্মায়
-
অহংকার ভাঙার সুযোগ আসে
সংসার থেকে পালালে এসব শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
রামঠাকুরের দর্শনে—
গৃহস্থ জীবন কোনো বাধা নয়,
বরং সাধনার পরীক্ষাগার।
কোথায় তাহলে সমস্যা?
সমস্যা সংসারে নয়,
সমস্যা আসক্তিতে।
স্ত্রী-সন্তান, অর্থ, সম্মান—
এই সবই জীবনের প্রয়োজন।
কিন্তু যখন মানুষ ভাবে—
“এগুলোই আমার সব”,
ঠিক তখনই বন্ধন তৈরি হয়।
মুক্তি মানে—
থাকা, কিন্তু আঁকড়ে না ধরা।
সংসারে থেকেও মুক্ত থাকার চাবিকাঠি
১. কর্তব্য পালন, ফলের আসক্তি নয়
নিজের কাজ করো, কিন্তু ফলকে নিজের পরিচয় বানিও না।
২. সম্পর্কে ভালোবাসা, অধিকারবোধ নয়
ভালোবাসো, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে চেও না।
৩. সুখ এলে কৃতজ্ঞতা, দুঃখ এলে ধৈর্য
দুটোকেই জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করো।
৪. জীবনের কেন্দ্রে নাম
নাম থাকলে সংসার ভারী হয় না।
সংসার ও নাম—বিরোধ নয়, সহযাত্রী
অনেকে বলেন—
“সংসার করলে নাম করা যায় না।”
আসলে ঠিক উল্টো—
সংসারের মাঝেই নামের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
চাপ, দায়িত্ব, উদ্বেগ—
এই সবের মধ্যেই নাম মানুষকে স্থির রাখে।
নাম শেখায়—
সবকিছুর মালিক আমি নই,
আমি কেবল একজন সেবক।
মুক্তি কোনো দূরের লক্ষ্য নয়
মুক্তি ভবিষ্যতের কোনো পুরস্কার নয়।
মুক্তি হলো—
আজকের মুহূর্তে মন হালকা থাকা।
যে মানুষ—
সংসারে থেকেও অহংকারে ভোগে না,
লাভ-ক্ষতিতে ভেঙে পড়ে না,
নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে—
সে-ই প্রকৃত অর্থে মুক্ত।
অধ্যায়ের সারকথা
সংসার ত্যাগ করতে হবে না,
ত্যাগ করতে হবে আসক্তি।
ঘর ছাড়লে মুক্তি নয়,
মন হালকা হলেই মুক্তি।
নামের আশ্রয়ে থেকে
সংসার করাই
রামঠাকুরের বাস্তব পথ।
সংসারে থেকেও মুক্ত থাকা যায়—
যদি জীবনের কেন্দ্রে থাকে নাম।
জয়রাম।
অধ্যায় ৩
সংসারে থেকেও মুক্তির পথ
গৃহস্থ জীবন বনাম ত্যাগ—রামঠাকুরের বাস্তব দর্শন
একজন মানুষ সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে পড়ে।
সারাদিনের দায়িত্ব, হিসাব, কথা, দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে বুকের ভিতর যেন ভারী পাথর।
হঠাৎ মনে হয়—
“এই জীবন কি শুধু দৌড়ানোর জন্য? শান্তি কি তবে আমার জন্য নয়?”
এই প্রশ্নই মানুষকে ভাবায় ত্যাগের কথা।
ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া, সব দায়িত্ব ছুড়ে ফেলে মুক্তি খোঁজা—
এই ভাবনা অনেকের মনেই আসে।
কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন
শ্রীশ্রী রামঠাকুর
একেবারে জীবনের মাটিতে দাঁড়িয়ে।
ত্যাগ কি পালিয়ে যাওয়া?
ত্যাগ কি মানে—
মায়ের হাত ছেড়ে দেওয়া?
স্ত্রীর চোখের জল উপেক্ষা করা?
সন্তানের দায়িত্ব ফেলে রাখা?
না।
এগুলো ত্যাগ নয়—এগুলো পালিয়ে যাওয়া।
রামঠাকুর শেখান—
ত্যাগ মানে কাউকে ছেড়ে যাওয়া নয়,
ত্যাগ মানে নিজের অহংকার ও আসক্তি ছেড়ে দেওয়া।
সংসার—বন্ধন না আশীর্বাদ?
সংসার আসলে ঈশ্বরেরই দেওয়া একটি ক্ষেত্র।
এখানেই মানুষ শেখে—
ভালোবাসা কী,
দায়িত্ব কী,
ত্যাগ কী,
ক্ষমা কী।
সংসার না থাকলে—
মানুষ নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে শেখে কোথায়?
সংসারের প্রতিটি সম্পর্ক
এক একটি পরীক্ষার মতো—
যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে চিনতে শেখে।
সংসার মানুষকে বেঁধে ফেলে কেন?
সংসার মানুষকে বেঁধে ফেলে না।
মানুষ নিজেই নিজেকে বেঁধে ফেলে।
“এটা আমার”,
“ওটা আমার”,
“ওরা আমার”—
এই ‘আমার’-এর বোঝাই আসল শৃঙ্খল।
যেদিন মানুষ বলতে শেখে—
“সবই তাঁর দেওয়া”—
সেদিনই শিকল আলগা হতে শুরু করে।
নাম—সংসারের ভিতর মুক্তির নিঃশ্বাস
সংসারের কোলাহলের মাঝে
নাম একটুখানি নিঃশ্বাস।
যখন কেউ না বোঝে,
যখন বোঝা যায় না কী করা উচিত—
নাম তখন মনে করিয়ে দেয়—
“তুমি একা নও।”
নাম সংসার ভাঙে না,
নাম সংসারকে সহনীয় করে তোলে।
গৃহস্থের সাধনা কেমন?
গৃহস্থের সাধনা—
ভোরে উঠে সংসারের কাজ করাও সাধনা,
সন্তানের জন্য চিন্তা করাও সাধনা,
সৎভাবে উপার্জন করাও সাধনা।
শর্ত একটাই—
সব কিছুর কেন্দ্রে নাম থাকতে হবে।
তাহলেই—
কাজ ক্লান্তি হয়ে ওঠে না,
দায়িত্ব বোঝা হয়ে ওঠে না।
মুক্তি কখন আসে?
মুক্তি তখন আসে—
যখন মানুষ ফলের হিসাব ছেড়ে দেয়,
যখন পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব মুছে যায়।
মুক্তি কোনো পাহাড়ে নয়,
মুক্তি কোনো আশ্রমে নয়—
মুক্তি থাকে শান্ত মনে।
অধ্যায়ের অন্তিম কথা
সংসার ছাড়লে মুক্তি নয়,
মনের ভার ছাড়লেই মুক্তি।
রামঠাকুর তাই বলেন—
ঘর ছেড়ো না,
মনকে নামের হাতে দাও।
সংসারের মাঝেই
যে নামের আশ্রয় নিতে পারে—
সে-ই সত্যিকারের মুক্ত।
জয়রাম।
অধ্যায় ৪
দুঃখ, ভয় ও অনিশ্চয়তার ওষুধ
জীবনের সংকটমুহূর্তে নাম কীভাবে শক্তি দেয়
জীবনের এমন কিছু মুহূর্ত আসে,
যখন মানুষ আর প্রশ্ন করতে পারে না—
শুধু নীরবে ভেঙে পড়ে।
কেউ কাছের মানুষকে হারায়,
কেউ বিশ্বাস হারায়,
কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্ধকার দেখে।
সেই মুহূর্তে উপদেশ কাজ করে না,
যুক্তি সান্ত্বনা দিতে পারে না।
তখন মানুষের দরকার হয় শুধু—
একটু ভরসা।
এই ভরসার নামই নাম।
দুঃখ আসে কেন?
দুঃখ আসে—
যখন আমরা যা চেয়েছিলাম, তা পাই না।
যখন যা পেয়েছিলাম, তা হারিয়ে ফেলি।
যখন ভবিষ্যৎ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
দুঃখ আসলে শাস্তি নয়।
দুঃখ হলো জীবনের ভাষা—
যা আমাদের বলে দেয়,
আমরা কোথায় বেশি আঁকড়ে ধরেছি।
ভয় কোথা থেকে জন্মায়?
ভয় জন্মায়—
হারানোর আশঙ্কা থেকে,
একাকীত্বের ভাবনা থেকে,
অজানা আগামীর চিন্তা থেকে।
ভয় আসলে শক্তির অভাব নয়,
ভয় হলো ভরসার অভাব।
অনিশ্চয়তা কেন এত কষ্ট দেয়?
কারণ মানুষ নিশ্চিত থাকতে চায়।
কিন্তু জীবন নিশ্চিত নয়।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই
মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখে।
নাম কী করে?
নাম কোনো অলৌকিক জাদু নয়,
নাম একটি গভীর মানসিক আশ্রয়।
শ্রীশ্রী রামঠাকুর শেখান—
নাম মানুষকে পালাতে শেখায় না,
নাম মানুষকে মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায়।
নাম করলে—
-
বুকের ভিতরের চাপ একটু হালকা হয়
-
শ্বাস ধীরে আসে
-
চিন্তা থেমে না, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে আসে
নাম মনে করিয়ে দেয়—
সবকিছু আমার হাতে নয়।
সংকটের মুহূর্তে নামের কাজ
যখন চিকিৎসার রিপোর্ট হাতে কাঁপে,
যখন চাকরির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত,
যখন প্রিয় মানুষের চোখে জল—
নাম তখন কানে কানে বলে—
“যা হবার হবে, তুমি সত্যের পাশে থাকো।”
এই কথাটুকুই মানুষকে দাঁড় করায়।
নাম শক্তি দেয় কীভাবে?
নাম—
ভয়কে ছোট করে,
অহংকার ভাঙে,
মনের বোঝা ভাগ করে নেয়।
নাম মানুষকে শেখায়—
ভেঙে পড়া লজ্জা নয়,
হাল ছেড়ে দেওয়াই পরাজয়।
ছোট একটি দৃশ্য
রাত গভীর।
ঘুম আসে না।
চিন্তা মাথার ভিতর ঘুরছে।
ঠিক তখন—
নাম ধীরে ধীরে জপতে থাকলে
মনের ভিতর এক অদ্ভুত নীরবতা নামে।
সমস্যা থাকে,
কিন্তু বুকের ভিতর আর দমবন্ধ লাগে না।
অধ্যায়ের অন্তিম কথা
দুঃখ যাবে,
ভয় যাবে,
অনিশ্চয়তাও যাবে।
কিন্তু যদি না-ও যায়—
নামের আশ্রয়ে মানুষ বদলে যায়।
নাম পরিস্থিতি বদলানোর আগে
মানুষকে বদলে দেয়।
আর মানুষ বদলালেই
জীবন বদলাতে শুরু করে।
নামের আশ্রয় নাও—
তুমি একা নও।
জয়রাম।
অধ্যায় ৫
বিশ্বাস ও ধৈর্যের সাধনা
মানুষ চায়—
সব কিছু এখনই ঠিক হয়ে যাক।
এখনই কষ্ট শেষ হোক,
এখনই সমস্যার সমাধান আসুক,
এখনই জীবন সহজ হয়ে যাক।
কিন্তু জীবন এমন নয়।
জীবন অপেক্ষা শেখায়।
এই অপেক্ষার মধ্যেই
মানুষের সবচেয়ে বড় সাধনা—
বিশ্বাস ও ধৈর্য।
বিশ্বাস কী?
বিশ্বাস মানে চোখ বন্ধ করে কিছু মেনে নেওয়া নয়।
বিশ্বাস মানে—
সব বুঝে ওঠার আগেই
নিজেকে ভরসার হাতে তুলে দেওয়া।
বিশ্বাস তখনই দরকার হয়—
যখন পথ পরিষ্কার নয়,
যখন উত্তর পাওয়া যায় না,
যখন মনে হয়—সব শেষ।
বিশ্বাস বলে—
“এখন না বুঝলেও, সবই অর্থহীন নয়।”
ধৈর্য কী?
ধৈর্য মানে কষ্ট সহ্য করা নয়।
ধৈর্য মানে—
কষ্টের মধ্যেও নিজেকে ভেঙে না ফেলা।
ধৈর্য হলো—
অপেক্ষা করার শক্তি,
নিজের উপর আস্থা রাখার শক্তি,
হাল না ছাড়ার শক্তি।
কেন বিশ্বাস ভেঙে যায়?
বিশ্বাস ভাঙে—
যখন প্রত্যাশা বেশি হয়,
যখন ফলের জন্য তাড়া থাকে,
যখন আমরা ভাবি—
“আমার সঙ্গে এমন কেন হলো?”
কিন্তু বিশ্বাসের প্রকৃতি আলাদা।
বিশ্বাস ফল চায় না,
বিশ্বাস পথ চায়।
রামঠাকুরের দৃষ্টিতে বিশ্বাস
শ্রীশ্রী রামঠাকুর বিশ্বাসকে দেখেছেন
জীবনের গভীরতম শক্তি হিসেবে।
তিনি শেখান—
বিশ্বাস মানে সব সময় সুখ পাওয়া নয়,
বিশ্বাস মানে—
যা-ই আসুক, তাকে ধারণ করার ক্ষমতা।
ধৈর্য না থাকলে কী হয়?
ধৈর্য না থাকলে—
মানুষ তাড়াহুড়ো করে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়,
রাগে সম্পর্ক ভেঙে ফেলে,
হতাশায় নিজেকে ছোট করে ফেলে।
ধৈর্য মানুষকে থামতে শেখায়—
আর থামতে পারাই অনেক সময় বাঁচিয়ে দেয়।
বিশ্বাস ও নাম—অভিন্ন পথ
বিশ্বাস একা টেকে না।
বিশ্বাসের আশ্রয় দরকার।
নাম সেই আশ্রয়।
নাম করলে—
বিশ্বাস গভীর হয়,
ধৈর্য স্বাভাবিক হয়ে আসে।
নাম মনে করিয়ে দেয়—
সব দায়িত্ব একা বহন করতে হয় না।
নীরব সাধনার পথ
বিশ্বাস ও ধৈর্যের সাধনা
কোনো বড় আচার নয়।
এটা—
প্রতিদিন একটু চুপ থাকা,
প্রতিদিন একটু নাম করা,
প্রতিদিন নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া—
“আমি চেষ্টা করছি, এটাই যথেষ্ট।”
অধ্যায়ের অন্তিম কথা
সব প্রশ্নের উত্তর এখনই আসে না।
সব কষ্টের অর্থ এখনই বোঝা যায় না।
কিন্তু যে মানুষ—
বিশ্বাস হারায় না,
ধৈর্য ছাড়ে না,
নামের আশ্রয় ধরে রাখে—
তার জীবন কখনো বৃথা যায় না।
বিশ্বাস পথ দেখায়,
ধৈর্য পথ চলতে শেখায়,
আর নাম—হাত ধরে রাখে।
জয়রাম।
অধ্যায় ৬
মানবপ্রেমই সত্য সাধনা
অনেক মানুষ সারাজীবন ঈশ্বরকে খোঁজে—
মন্দিরে, তীর্থে, গ্রন্থে, মন্ত্রে।
কিন্তু প্রতিদিন যাদের চোখের সামনে দেখা যায়,
যাদের হাসি-কান্না স্পর্শ করে—
সেই মানুষগুলোকেই আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।
অথচ সত্য সাধনার শুরু এখানেই।
সাধনা মানে কী?
সাধনা মানে শুধু ধ্যান, জপ, উপবাস নয়।
সাধনা মানে—
নিজের স্বার্থের গণ্ডি একটু একটু করে ভাঙা।
যেখানে শুধু “আমি” নয়,
সেখানে “তুমি”-র জায়গা তৈরি হয়—
সেখানেই সাধনার প্রথম আলো জ্বলে।
মানবপ্রেম কেন এত কঠিন?
কারণ মানুষ নিখুঁত নয়।
মানুষ ভুল করে, আঘাত দেয়, কষ্ট দেয়।
দেবতার প্রতি ভক্তি সহজ—
তিনি আমাদের প্রতিদিন পরীক্ষা নেন না।
কিন্তু মানুষের সঙ্গে থাকতে গেলে
ধৈর্য লাগে, ক্ষমা লাগে, বোঝাপড়া লাগে।
এই কঠিন পথটাই
সত্য সাধনার পথ।
রামঠাকুরের দর্শনে মানবপ্রেম
শ্রীশ্রী রামঠাকুর বলেছেন—
মানুষ এক, মানবজাতি এক।
তিনি জাতি, ধর্ম, মতের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে
মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখিয়েছেন।
কারণ—
যে মানুষকে ভালোবাসতে পারে না,
সে ঈশ্বরকেও সত্যিকারে ভালোবাসতে পারে না।
মানবপ্রেমের সহজ রূপ
মানবপ্রেম মানে বড় কিছু করা নয়।
এটা হতে পারে—
-
কারো কথা মন দিয়ে শোনা
-
ক্লান্ত কাউকে একটু আশ্বাস দেওয়া
-
ক্ষমা করে দেওয়া, যখন সহজ ছিল প্রতিশোধ
-
বিচার করার আগে বোঝার চেষ্টা করা
এই ছোট ছোট কাজেই
সাধনা নীরবে সম্পন্ন হয়।
নাম ও মানবপ্রেম—একই স্রোত
নাম যদি হৃদয়ে সত্যি জাগে,
তাহলে সে হৃদয় কঠিন থাকতে পারে না।
নাম মানুষকে শেখায়—
সবাই নিজের মতো করে লড়ছে।
এই উপলব্ধি থেকেই
মানবপ্রেম জন্মায়।
মানুষই আয়না
সংসারের মানুষগুলোই আমাদের আয়না।
তাদের মাধ্যমেই—
আমাদের রাগ ধরা পড়ে,
আমাদের অহংকার ভাঙে,
আমাদের ধৈর্য পরীক্ষা হয়।
যে মানুষ এই আয়না থেকে পালায়,
সে নিজের সাধনাও অসম্পূর্ণ রাখে।
অধ্যায়ের অন্তিম কথা
ঈশ্বর দূরে নন,
তিনি মানুষের মধ্যেই প্রকাশিত।
মানুষকে ভালোবাসতে শিখলে
ভক্তি আলাদা করে খুঁজতে হয় না।
যে হৃদয়ে মানবপ্রেম জাগে—
সেই হৃদয়ই মন্দির,
সেই জীবনই সাধনা।
মানুষকে ভালোবাসো—
সেখানেই ঈশ্বরের স্পর্শ।
জয়রাম।
অধ্যায় ৭
আধুনিক জীবনে রামঠাকুরের বাণী
আজকের মানুষ দ্রুত হাঁটে, দ্রুত ভাবে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়—
কিন্তু ধীরে বাঁচতে ভুলে গেছে।
মোবাইলের স্ক্রিনে ভরা জীবন,
ক্যালেন্ডারে ভরা দিন,
কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা।
এই সময়ে প্রশ্ন ওঠে—
এত অগ্রগতির মাঝেও কেন মন শান্ত নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যায়—
শ্রীশ্রী রামঠাকুর–এর বাণী আজ আগের চেয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
আধুনিক জীবনের মূল সংকট
আজকের মানুষ—
সবকিছু চায়, কিন্তু তৃপ্তি পায় না।
সংযোগে ভরা, কিন্তু একাকী।
সাফল্যে ঘেরা, কিন্তু ভেতরে ভয়।
কারণ জীবন থেকে কেন্দ্র হারিয়ে গেছে।
রামঠাকুরের বাণী সেই কেন্দ্রের কথাই বলে।
কাজ, দায়িত্ব ও নাম
আধুনিক জীবন মানেই কাজ—
চাপ, প্রতিযোগিতা, সময়ের অভাব।
রামঠাকুর কাজকে অস্বীকার করেননি।
তিনি বলেছেন—
কাজ করো, কিন্তু কাজের দাস হয়ো না।
নাম থাকলে—
কাজে অহংকার আসে না,
ব্যর্থতায় আত্মসম্মান ভাঙে না।
নাম কাজকে পবিত্র করে।
সম্পর্কের জটিলতা ও বাণী
আজ সম্পর্ক আছে, কিন্তু গভীরতা কম।
ভালোবাসা আছে, কিন্তু ধৈর্য কম।
রামঠাকুর শেখান—
ভালোবাসা মানে দাবি নয়,
ভালোবাসা মানে গ্রহণ।
এই বাণী আজ দাম্পত্য, পরিবার, সমাজ—
সবখানেই প্রয়োজন।
ভোগের যুগে সংযম
আধুনিক জীবন ভোগকে সহজ করেছে,
কিন্তু সংযমকে কঠিন।
রামঠাকুর ভোগের বিরোধী নন,
তিনি আসক্তির বিরোধী।
তিনি শেখান—
ভোগ করো, কিন্তু হারিয়ে যেও না।
এই শিক্ষা মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার
সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
প্রযুক্তির যুগে আধ্যাত্মিকতা
প্রযুক্তি মানুষকে যুক্ত করেছে,
কিন্তু অন্তরের সঙ্গে সংযোগ কমেছে।
রামঠাকুরের বাণী কোনো প্রযুক্তির বিরোধী নয়।
তিনি শুধু মনে করিয়ে দেন—
দিনের শেষে নিজেকে ফিরে পাওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।
নামের আশ্রয়ে সেই ফিরে পাওয়া সম্ভব।
ছোট অভ্যাস, বড় পরিবর্তন
রামঠাকুরের পথ কোনো বড় বিপ্লব নয়।
এটা—
প্রতিদিন একটু নাম,
প্রতিদিন একটু ধৈর্য,
প্রতিদিন একটু মানবপ্রেম।
এই ছোট ছোট অভ্যাসই
আধুনিক জীবনে বড় পরিবর্তন আনে।
অধ্যায়ের অন্তিম কথা
আধুনিক জীবন পাল্টাবে না,
চাপ কমবে না,
প্রযুক্তি থামবে না।
কিন্তু মানুষ বদলাতে পারে।
যে মানুষ—
রামঠাকুরের বাণীকে জীবনের কেন্দ্রে রাখে,
সে আধুনিক হয়েও অস্থির হয় না।
সময় বদলায়,
মানুষ বদলায়,
কিন্তু সত্যের পথ বদলায় না।
জয়রাম।
দৈনন্দিন জীবনচর্চার সহজ পথ
অনেক মানুষ ভাবে—
আধ্যাত্মিক জীবন মানেই আলাদা সময়,
আলাদা পরিবেশ,
আলাদা নিয়ম।
কিন্তু বাস্তবে জীবন এমন সুযোগ দেয় না।
কাজ আছে, পরিবার আছে, দায়িত্ব আছে।
এই বাস্তবতার মাঝেই প্রশ্ন আসে—
“আমি কীভাবে প্রতিদিন এই পথে চলব?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ করে দিয়েছেন
শ্রীশ্রী রামঠাকুর।
তিনি কখনো কঠিন নিয়ম চাপিয়ে দেননি।
তিনি দেখিয়েছেন—
সহজ পথই দীর্ঘ পথ।
দিন শুরু হোক নীরবতায়
দিনের শুরু যদি অস্থির হয়,
তাহলে সারা দিনটাই ভারী হয়ে যায়।
ভোরে বা সকালে—
একটু চুপ করে বসে
দুই-একবার নাম স্মরণ করাই যথেষ্ট।
বেশি সময় নয়,
মন দিয়ে একটু সময়।
এই অল্প সময়টাই
দিনের ভিত গড়ে দেয়।
কাজের মাঝেও সাধনা
সাধনা মানে কাজ ছেড়ে বসে থাকা নয়।
সাধনা মানে—
কাজের মধ্যেও সচেতন থাকা।
খাওয়ার সময় খাওয়া,
কাজের সময় কাজ,
কথা বলার সময় মন দিয়ে শোনা—
এই মনোযোগই সাধনা।
নাম মনে থাকলে—
কাজ যন্ত্রণা হয়ে ওঠে না।
সম্পর্কেই পরীক্ষা
প্রতিদিন মানুষের সঙ্গে থাকতে হয়।
এখানেই আসল পরীক্ষা।
কেউ কথা রাখে না,
কেউ কষ্ট দেয়,
কেউ বোঝে না।
এই মুহূর্তগুলোতেই
নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—
“আমি কি আজ একটু ধৈর্য ধরতে পারি?”
এই একটুখানি চেষ্টাই
দৈনন্দিন সাধনার বড় ধাপ।
দুঃখ এলে কী করবে?
দুঃখ এলে দুঃখকে অস্বীকার কোরো না।
নিজেকে বলো—
“এটা এখন এসেছে, চলে যাবে।”
নাম এই সময়ে সঙ্গী হয়।
নাম কাঁধে হাত রাখে,
কষ্ট কম না-ও করতে পারে,
কিন্তু মানুষকে একা হতে দেয় না।
ছোট নিয়ম, বড় ফল
-
দিনে একবার কৃতজ্ঞ হও
-
দিনে একবার কাউকে ক্ষমা করো
-
দিনে একবার নিজের ভুল স্বীকার করো
-
দিনে একবার নাম স্মরণ করো
এই ছোট নিয়মগুলো
ধীরে ধীরে জীবন বদলে দেয়।
সাধনা মানে ধারাবাহিকতা
আজ ভালো লাগছে বলে নাম নয়,
আজ খারাপ লাগছে বলেও নাম।
নামের আসল শক্তি
নিয়মিততায়।
যেমন শ্বাস—
ভাবতে হয় না, তবু চলে।
অধ্যায়ের অন্তিম কথা
জীবনচর্চার পথ কঠিন নয়,
কিন্তু নিয়মিত।
বড় কিছু করতে হবে না,
নিজেকে ভাঙতে হবে না।
শুধু—
প্রতিদিন একটু সচেতনতা,
প্রতিদিন একটু নাম,
প্রতিদিন একটু মানবপ্রেম।
এই নিয়েই
জীবন ধীরে ধীরে পবিত্র হয়।
সহজ পথেই গভীরতা।
নিয়মিত পথেই মুক্তি।
জয়রাম।
অধ্যায় ১০
নামের আলোয় ভবিষ্যৎ পথচলা
(শেষ অধ্যায়)
জীবন কখনো থেমে থাকে না।
আজ যা আছে, কাল তা বদলাবে।
মানুষ বদলাবে, পরিস্থিতি বদলাবে,
সময় তার নিজের নিয়মে এগিয়ে যাবে।
কিন্তু এই পরিবর্তনের স্রোতে
একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—
আমি কীভাবে চলব?
এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের হাতে নয়,
এই মুহূর্তের ভিতরেই লুকিয়ে আছে।
আর সেই উত্তর হলো—
নাম।
ভবিষ্যৎ মানেই কি অনিশ্চয়তা?
হ্যাঁ।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
কিন্তু অনিশ্চয়তা ভয়ের কারণ তখনই হয়,
যখন মানুষের ভিতরে কোনো আশ্রয় থাকে না।
নামের আশ্রয়ে থাকলে
ভবিষ্যৎ আর অন্ধকার মনে হয় না।
নাম বলে—
“যা আসবে, আসুক—
তুমি একা নও।”
নাম ভবিষ্যৎ বদলায় না, মানুষকে বদলায়
নাম কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
নাম কোনো প্রতিশ্রুতি নয়—
যে সব ঠিকই হবে।
নাম করে মানুষ বদলায়—
তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়,
তার সহ্যশক্তি বাড়ে,
তার ভরসা গভীর হয়।
আর মানুষ বদলালেই
ভবিষ্যৎকে দেখার চোখ বদলে যায়।
রামঠাকুরের পথ—চলার পথ
শ্রীশ্রী রামঠাকুর
কখনো বলেননি—
সব বুঝে নাও, তারপর চলো।
তিনি বলেছেন—
নামের আশ্রয়ে চলতে চলতেই
বুঝে আসবে।
এই পথ—
ভয়ের পথ নয়,
অহংকারের পথ নয়,
পালিয়ে যাওয়ার পথ নয়।
এটি দাঁড়িয়ে থাকার পথ।
আগামী দিনের মানুষের জন্য এই বাণী
আগামী দিনের জীবন আরও দ্রুত হবে,
আরও জটিল হবে,
আরও প্রতিযোগিতায় ভরা হবে।
এই সময়ে মানুষ যদি
নামের সঙ্গে যুক্ত না থাকে,
তাহলে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে।
নাম মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—
তুমি কেবল উৎপাদনের যন্ত্র নও,
তুমি কেবল ফলাফলের হিসাব নও—
তুমি একজন মানুষ।
শেষ কথা নয়, শুরু কথা
এই বইয়ের এখানেই শেষ,
কিন্তু পথ এখানেই শুরু।
নামের আলো কোনো পাতায় আটকে থাকে না,
এটা জীবনের সঙ্গে হাঁটে।
আজ একটু নাম,
কাল একটু ধৈর্য,
পরশু একটু মানবপ্রেম—
এই নিয়েই পথচলা।
অন্তিম প্রার্থনা
হে নাম,
আমাদের অহংকার কমাও,
আমাদের ভয় হালকা করো,
আমাদের হৃদয় মানবপ্রেমে ভরিয়ে দাও।
যেন আমরা—
সংসারে থেকেও সত্যকে ভুলে না যাই,
কষ্টে পড়েও বিশ্বাস হারাই না,
আর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত
নামের আশ্রয় ছাড়তে না পারি।
নামের আলোয় চলুক জীবন।
নামের আলোয় চলুক ভবিষ্যৎ।
জয়রাম।
সমাপ্তি পৃষ্ঠা (Colophon)
গ্রন্থের নাম :
নামের আলোয় জীবন
শ্রীশ্রী রামঠাকুরের বাণীতে আধুনিক মানুষের পথচলা
ভাবনা ও রচনা :
এই গ্রন্থ কোনো পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের প্রয়াস নয়।
এটি একজন সাধারণ মানুষের অন্তর থেকে উঠে আসা
নামের প্রতি বিশ্বাস, জীবনের অভিজ্ঞতা
এবং মানবপ্রেমের নীরব স্বীকারোক্তি।
অনুপ্রেরণা :
শ্রীশ্রী রামঠাকুর–এর বাণী,
যা সহজ ভাষায় জীবনকে সহজ করে তোলে।
গ্রন্থের উদ্দেশ্য :
এই বইয়ের উদ্দেশ্য কাউকে বদলে দেওয়া নয়,
বরং পাঠকের ভিতরে থাকা আলোর কথাটি
মনে করিয়ে দেওয়া।
যদি এই গ্রন্থ—
কোনো ক্লান্ত মনে একটু শান্তি আনে,
কোনো হতাশ হৃদয়ে একটু ভরসা জাগায়,
কিংবা কাউকে নামের পথে এক কদম এগোতে সাহায্য করে—
তবেই এর সার্থকতা।
কৃতজ্ঞতা :
সেই অদৃশ্য শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা,
যিনি শব্দকে ভাব দিলেন,
ভাবকে অনুভব দিলেন,
আর অনুভবকে নামের সঙ্গে যুক্ত করলেন।
সব পাঠকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা—
যাঁরা এই বইয়ের প্রতিটি পাতায়
নিজের জীবনের প্রতিধ্বনি খুঁজে পেয়েছেন।
শেষ নিবেদন :
এই গ্রন্থ পাঠের পর
যদি পাঠক কিছু ভুলে যান—
শব্দ, বাক্য, অধ্যায়—
তবু যদি একটিমাত্র জিনিস মনে থাকে—
নামই আশ্রয়,
নামই ভরসা,
নামই পথ।
জয়রাম।
লেখকের কথা
(Author’s Note)
আমি কোনো সাধক নই, কোনো তত্ত্ববিদও নই।
আমি একজন শিক্ষক—যিনি জীবনের নানা স্তরে মানুষকে দেখেছেন,
তাদের প্রশ্ন, কষ্ট, আশা ও দ্বন্দ্বকে খুব কাছ থেকে অনুভব করেছেন।
শিক্ষাজীবনে সমাজবিজ্ঞান আমাকে মানুষকে বুঝতে শিখিয়েছে,
বিশুদ্ধ বিজ্ঞানে পড়াশোনা আমাকে যুক্তির চোখ দিয়েছে,
ফার্মেসি ও শিক্ষাশাস্ত্র আমাকে দায়িত্ব ও শৃঙ্খলার মূল্য বুঝিয়েছে,
আর ইলেকট্রনিক্স শিখিয়েছে—সবকিছুর পেছনে একটি সংযোগ থাকে।
কিন্তু জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর
শুধু পাঠ্যবইয়ে পাইনি।
পেয়েছি জীবনের চলার পথে,
নীরব মুহূর্তে,
এবং নামের আশ্রয়ে।
এই বইটি লেখার উদ্দেশ্য
নিজেকে বড় করে তোলা নয়,
বরং নিজের মতো করে পাওয়া আলো
অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
আমি বিশ্বাস করি—
আধ্যাত্মিকতা কোনো পলায়ন নয়,
এটি জীবনের মাঝেই দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি।
যদি এই বইয়ের কোনো একটি লাইন
কাউকে একটু ধৈর্য ধরতে সাহায্য করে,
কোনো ভাঙা মনকে সামান্য ভরসা দেয়,
অথবা কাউকে নামের পথে এক কদম এগিয়ে দেয়—
তাহলেই আমার লেখা সার্থক।
এই গ্রন্থ আমার শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের সম্মিলিত প্রতিফলন।
এর সমস্ত সীমাবদ্ধতার দায় আমার,
আর যদি কোথাও আলো থাকে—
তা নামেরই কৃপা।
সব পাঠকের প্রতি
আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও প্রণাম।
জয়রাম।
—
Subrata Majumder
MA (Sociology),
B.Sc (Pure Science),
D.Pharm,
B.Ed / CETE,
Diploma in Electronics
Back Cover
এই বইটি কোনো তত্ত্বগ্রন্থ নয়।
এটি এক ক্লান্ত মানুষের সঙ্গে আরেক ক্লান্ত মানুষের নীরব কথা বলা।
জীবনের দৌড়ে, সম্পর্কের টানাপোড়েনে,
ভয়, দুঃখ আর অনিশ্চয়তার মাঝে
যদি আপনি এক মুহূর্তের শান্তি খুঁজে থাকেন—
এই বইটি আপনার জন্য।
শ্রীশ্রী রামঠাকুর–এর সহজ অথচ গভীর বাণীর আলোয়
এই গ্রন্থ দেখায়—
সংসারে থেকেও মুক্ত থাকা যায়,
ভেঙে পড়েও বিশ্বাস রাখা যায়,
আর নামের আশ্রয়ে জীবন হালকা করা যায়।
এখানে কঠিন সাধনা নেই,
আছে সহজ পথ।
আছে নাম, মানবপ্রেম আর ধৈর্যের নীরব শিক্ষা।
একটি বই শেষ হতে পারে,
কিন্তু এই পথচলা শেষ হয় না।
নামের আলোয় জীবন—
যেখানে শুরু হয় ভরসা।
Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel)
on
January 17, 2026
Rating:
.png)





.jpg)
No comments: